শক্তিশালী টাইফুন চাম্পির আঘাতে তাইওয়ানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫২৭ জন। ঝড়ো হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টিতে গাছপালা উপড়ে পড়েছে দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে। এরইমধ্যে প্রায় তিন লাখ ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাতিল হয়েছে শত শত ফ্লাইট।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শনিবার তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূল ঘেঁষে চীনের উপকূলের দিকে ধেয়ে যায় টাইফুন চাম্পি। তবে তাইওয়ানে আঘাত হানায় এরইমধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি হারাতে শুরু করেছে। কাজেই এটি চীনের উপকূলে প্রভাব ফেললেও মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানবে না বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
টাইফুন চাম্পি চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর একটি।
তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শক্তি কমলেও ঝড়টির কেন্দ্রের কাছে ঘণ্টায় প্রায় ১২৬ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইছে।
শনিবার ভোরে তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইলান কাউন্টির উপকূল ঘেঁষে বয়ে যাওয়ার পর ঝড়টির কেন্দ্র দ্বীপটির প্রায় ১৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থান করছিল। মধ্যরাতের দিকে ঝড়টির কেন্দ্র দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে ইলানের উপকূল বরাবর অগ্রসর হয়। পরে উপকূলের অদূরে সাগরের ওপর বিরল এক ঘূর্ণিপথ তৈরি করে আবার উত্তর দিকে সরে যায়।
এসময় উপকূলের কয়েকটি এলাকায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২৭ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যায়। এতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে এবং বাড়িঘরের ছাদর বিভিন্ন অংশ উড়ে যায়।
তাইওয়ানের ফায়ারসার্ভিস ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা এখন পর্যন্ত একজন। দ্বীপটির লিউচিউ এলাকা থেকে এক ব্যক্তি সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে মারা যান। প্রবল বাতাস ও মুষলধারে বৃষ্টিতে আহত হয়েছেন ৫২৭ জন।
তাইওয়ানের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাইপাওয়ার জানিয়েছে, ঝড়ের কারণে দুই লাখ ৮৮ হাজারের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এরই মধ্যে অধিকাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়েছে।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ২৫৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আগের দিন শুক্রবার প্রায় এক হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল। সে তুলনায় শনিবার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

রাজধানী তাইপেতেও ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়েছে এবং থেমে থেমে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হয়েছে।
ইলানের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লিন ঝড়ের ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘মধ্যরাতের দিকেই পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। বহু বছর এমন কিছু দেখিনি।’
রাজধানী তাইপের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী থমাস ওয়াং বলেন, ‘পরিস্থিতি সত্যিই বেশ ভয়ংকর ছিল।’
ঝড়ের কারণে রাজধানী তাইপেসহ উত্তর ও মধ্য তাইওয়ানের স্থানীয় প্রশাসন শনিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চাম্পি উত্তর দিকে মোড় নিয়ে চীনের উপকূল বরাবর অগ্রসর হবে। পরে এটি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এদিকে ঝড়টি এগিয়ে আসায় চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশে জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ দল পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৪০০ উদ্ধারকর্মী এবং ৬০০টি উদ্ধার ও জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ৪১ হাজারের বেশি ফায়ারসার্ভিসের কর্মীকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, ঝেজিয়াং প্রদেশের উপকূলীয় শহর তাইঝৌতে তিন হাজার ৮০০টির বেশি মাছ ধরার নৌকা বন্দরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সমুদ্রের মাছের খামারে কর্মরত শ্রমিকদেরও নিরাপদে তীরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থানরত দুই হাজার ৮৪ জন দর্শনার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।


