বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়রের বাড়ি থেকে শিশুদের যৌন নিপীড়নের ছবি পাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন মার্কিন অভিনেত্রী ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের পুত্রবধূ মেগান মার্কেল।
সম্প্রতি তার ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়র ফিলিপাইনে বাবার সাবেক বাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে শিশুদের যৌন নির্যাতন করার হাজার হাজার ছবি খুঁজে পান। পরে তিনি একটি পুলিশের কাছে চিঠির মাধ্যমে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সান থমাস মার্কেল সিনিয়রের ফিলিপাইনের সাবেক বাড়ি থেকে শত শত শিশুকে যৌন নিপীড়নের ছবি প্রকাশের খবরটি প্রকাশ্যে আনে।
এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রিন্স হ্যারির স্ত্রী ও ডাচেস অব সাসেক্স মেগান বলেন, রাজপরিবার ও বিশেষ ব্যক্তিদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগকে ২০১৮ সালেই তার বাবার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগসংবলিত একটি চিঠি লন্ডন পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছিল। পরে পুলিশই ওই চিঠির বিষয়বস্তু তাকে জানায়। চিঠিতে তার বাবার বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ ছিল যা উদ্বেগজনক ও বিচলিত হওয়ার মতো।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় শুক্রবার এক বিবৃতিতে মেগান বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। যেসব শিশু ক্ষতির শিকার হয়ে থাকতে পারে, তাদের কথাই এখন আমার মনে পড়ছে।’
মেগান বলেন, ‘চিঠিতে আমার বাবার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে পুলিশ আমাকে আশ্বস্ত করেছিল ওই অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে।’
মার্কিন নাগরিক ও অভিনেত্রী মেগান ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের উইন্ডসর ক্যাসেলে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারিকে বিয়ে করেন।
মেগানের বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়র টেলিভিশনের আলোকসজ্জা ও আলোকচিত্র পরিচালনার কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে ২০১৮ সালে মেয়ের বিয়েতে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এরপর থেকেই বাবার সঙ্গে মেগানের সম্পর্কের অবনতি নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার পর নতুন মর্যাদার কারণে বাবাকে এড়িয়ে চলছেন মেগান।

তবে বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক না রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ডাচেস অব সাসেক্স। তিনি বলেন, ‘আশা করি এখন সবাই বুঝতে পারবেন, বাবার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখায় বছরের পর বছর কিছু সংবাদমাধ্যম বিষয়টি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে বাবার কাছ থেকে দূরে থাকা এবং তাকে আমাদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে একটিই কারণ ছিল। সেটি হলো আমার সন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।’
এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তারা হলো- প্রিন্স আর্চি ও প্রিন্সেস লিলিবেট।
শুক্রবারের বিবৃতিতে মেগান বলেন, ‘এখন যা প্রকাশ পেয়েছে, তার ব্যাপকতা কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর ও ঘৃণ্য। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত হবে এবং নিরপরাধ শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’
চলতি বছরের শুরুর দিকে ফিলিপাইনে বসবাস করছিলেন থমাস মার্কেল সিনিয়র। সেখানে তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন এবং তার বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। শারীরিক জটিলতার কারণেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে হয়।
দ্য সানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ফিলিপাইনের সেবু শহরে বাবার সাবেক বাড়ি পরিষ্কার করছিলেন থমাস মার্কেল জুনিয়র। সেখানে কয়েকটি বাক্সের মধ্যে তিনি শিশুদের যৌন নিপীড়নের হাজার হাজার ছবি খুঁজে পান বলে দাবি করেন।
থমাস মার্কেল জুনিয়র পত্রিকাটিকে জানান, ছবিগুলো পাওয়ার পর তিনি ফিলিপাইনের পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর আমি বাবার পাশে থেকেছি, তার যত্ন নিয়েছি এবং তাকে সাহায্য করেছি। কিন্তু এখন থেকে সব বন্ধ। বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা না হলে আমি তার সঙ্গে আর কখনো কথা বলব না।’
এদিকে ফিলিপাইনের জাতীয় তদন্ত ব্যুরোর পরিচালক মেলভিন মাতিবাগ বার্তা সংস্থা এপিকে জানান, থমাস মার্কেল জুনিয়রের আনা অভিযোগ তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই তাদের সহায়তা চেয়েছে।
মাতিবাগ বলেন, ম্যানিলায় এফবিআইয়ের কার্যালয় থেকে থমাস মার্কেল জুনিয়রের লেখা একটি চিঠি ফিলিপাইনের একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় তদন্ত ব্যুরোর নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিভাগও রয়েছে।
চিঠিতে থমাস মার্কেল জুনিয়র দাবি করেন, উদ্ধার করা উপকরণগুলোতে শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্পষ্ট যৌনভাবে কিংবা যৌন শোষণমূলক পরিস্থিতিতে দেখানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মাতিবাগ জানান, থমাস মার্কেল জুনিয়র তার পাওয়া ‘আপত্তিকর প্রমাণগুলো’ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে প্রস্তুত থাকার কথাও জানিয়েছেন।
তিনি জানান, তার বাবা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অন্যের সহায়তায় বসবাসের সুবিধাযুক্ত একটি আবাসিক পরিচর্যাকেন্দ্রে রয়েছেন।
অন্যদিকে ৮২ বছর বয়সী থমাস মার্কেল সিনিয়র তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ডেইলি মেইলকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ছেলের এমন অভিযোগে তিনি হতবাক হয়ে গেছেন।
থমাস মার্কেল সিনিয়র বলেন, ‘আমারই ছেলে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করছে, এতে আমি হতবাক, কষ্ট পেয়েছি এবং ভীষণভাবে মর্মাহত। আমার বিরুদ্ধে যে কাজের অভিযোগ আনা হয়েছে, আমি কখনোই এমন কিছু করতে পারি না। একজন মানুষের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ আর হতে পারে না।’
মেগান মার্কেলের সৎবোন সামান্থা মার্কেল তাদের বাবার পক্ষ নিয়ে ভাই থমাস মার্কেল জুনিয়রের বিরুদ্ধে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ সাজানোর অভিযোগ তুলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে সামান্থা বলেন, ‘এসব জঘন্য অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আমার ভাই এসব অভিযোগ বানিয়ে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ করেছে। সে আমাদের বাবাকে ধ্বংস করতে চায়। তার লজ্জা হওয়া উচিত।’
‘বাবা তাকে অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দিতেই সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য সে সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যাগুলো বানিয়ে বলতে শুরু করে। গত দুই বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটারগুলো বাবার কাছে ছিল না। ফলে তাকে ফাঁসানোর জন্য সেগুলোতে আপত্তিকর উপকরণ রাখা হয়ে থাকতে পারে’ বলে দাবি করেন সামান্থা।


