ইয়েমেনের লাহিজ গভর্নরেটের তপ্ত মরুভূমির নিচে একটি অস্থায়ী তাঁবুর বাইরে পরিবারের সঙ্গে বসে আছেন মাহের। মোখার এই সাবেক জেলের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলে কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে পরিবার নিয়ে পায়ে হেঁটে পালিয়ে যান তিনি। টানা দেড় দিন পথ চলার পর আশ্রয় মেলে লাহিজের একটি অস্থায়ী শিবিরে।
পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া ২ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি বেসামরিক মানুষ এই অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় পেয়েছেন । তারা সবাই চলতি বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের আকস্মিক উপকূলীয় অভিযানের মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারি করা উঁচু এলাকাগুলো দখল করে নেয়। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগপথে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনও হুমকির মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করেন। প্রায় ১০০টি সৌদি যুদ্ধবিমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নতুন আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য–হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা এবং তাইজ শহরের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া।

তবে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স, জায়ান্টস ব্রিগেডস এবং স্থানীয় সালাফি ইউনিটগুলোর মধ্যে বিভক্ত নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামোর কারণে সরকারপন্থী জোট এখনও কার্যকরভাবে এগোতে পারছে না। ফলে, ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে এই সংঘাত এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের অভ্যন্তরে শক্তি সঞ্চয় করা হুথিরা একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে তেল অবকাঠামো এবং রিয়াদ, আবহা ও দাম্মামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো। পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে অঞ্চলটি। আর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের এই সংঘাতের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

ইয়েমেনে মানবিক সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশটির ১ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলেরার ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য অর্থের তীব্র ঘাটতি। সব মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
অস্থায়ী শিবিরে গাদাগাদি করে থাকা পরিবারগুলোর কাছে বিশুদ্ধ পানীয় জলও যেন এক দুর্লভ বিষয়। নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার কিংবা চিকিৎসার নিশ্চয়তা–কোনোটিই তাদের কাছে সহজলভ্য নয়। মাহের ও তার পরিবারের কাছে এই যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়। তাদের কাছে যুদ্ধ মানে হারানো ঘর, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর প্রতিদিন বেঁচে থাকার এক নিরন্তর, কঠিন সংগ্রাম।


