মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি রাশিয়া-ইউক্রেন

মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি রাশিয়া-ইউক্রেন
মেলানিয়া ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এবার যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ইউক্রেন ও রাশিয়ার কর্মকর্তারা। এই যুদ্ধবিরতির আওতায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার দখলে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং আটকে পড়া বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরটি এখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে।’

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, শুক্রবার ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা দক্ষিণ ইউক্রেনের যুদ্ধবিভক্ত খেরসন অঞ্চলের রুশনিয়ন্ত্রিত ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান।

আগামী সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এর আওতায় ত্রাণ সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সমঝোতা অনুযায়ী, প্রথমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। এরপর শহরটিতে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো হবে। সবশেষে বেসামরিক নাগরিকদের ওলেশকি ছেড়ে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে নিজের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ওলেশকির ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানতে পারেন মেলানিয়া ট্রাম্প। এরপর তিনি শহরটির বাসিন্দাদের সহায়তায় আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেন।

এর আগে অন্য একটি বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি। সেই যোগাযোগের ভিত্তিতেই ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।

রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ জানিয়েছেন, মস্কোর স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৪টা থেকে খেরসন অভিমুখে রুশ বাহিনী গোলাগুলি বন্ধ রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী তখন সোমবার গভীর রাত।

গেরাসিমভ বলেন, ওলেশকির কাছে মানবিক অভিযান পরিচালনার জন্যই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, রুশ বাহিনী ওই এলাকায় প্রকৌশলগত পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চালাবে এবং শহরে ত্রাণবাহী যানবহরের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ওলেশকি শহর। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, মেলানিয়া ট্রাম্প ও তার একজন প্রতিনিধি যুদ্ধবিরতির শর্ত নির্ধারণে সরাসরি রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন।

আলোচনায় ইউক্রেনের প্রধান প্রতিনিধি দিমিত্রো লুবিনেৎস বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকে রাশিয়ার সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের যুদ্ধবিরতি শুরু হবে। মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরুর দুই দিন আগে এটি কার্যকর হবে এবং কয়েক দিন স্থায়ী হবে।

যুদ্ধবিরতি শুধু ওলেশকি শহরে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং খেরসন অঞ্চল এবং মানবিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আশপাশের এলাকাতেও এটি কার্যকর হবে বলে জানান লুবিনেৎস।

তার মতে, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ার কর্মকর্তারাও যুদ্ধবিরতির সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আরও পড়ুন

এর আগে শুক্রবার মেলানিয়া ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে লুবিনেৎস বলেন, ‘অভিযানটি ধাপে ধাপে পরিচালনা করা হবে এবং এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো ও লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার আগে ওলেশকিতে যাওয়ার পথ থেকে পুঁতে রাখা স্থলমাইন অপসারণ করতে হবে।’

তবে যুদ্ধবিরতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে কিংবা ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে এসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন।

অবশ্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতা সইয়ের সময় কিংবা যুদ্ধবিরতি চলমান থাকার সময় মেলানিয়া ট্রাম্প ইউক্রেন সফরে যাবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি লুবিনেৎস।

তিনি বলেন, ‘মেলানিয়া ট্রাম্প যখন ওলেশকির পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তার সমন্বয়ে আলোচনা শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা বিভিন্ন প্রশ্ন, উদ্যোগ ও ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছি। ওলেশকির বেসামরিক নাগরিকদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করতে আমরা নতুন পদ্ধতি, ব্যবস্থা ও উপায় তৈরি করেছি।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত ওলেশকি শহর। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

রাশিয়ার মানবাধিকার কর্মকর্তা ইয়ানা লানত্রাতোভাও মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ওলেশকিতে মানবিক অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। ওই আলোচনায় তিনি নিজেও অংশ নিয়েছেন জানিয়ে লানত্রাতোভা বলেন, এ ধরনের মানবিক সহায়তা দেওয়া রাশিয়ার অগ্রাধিকার।

অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, প্রথমে শহরের বাসিন্দাদের কী কী প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে। এরপর খাদ্য, ওষুধ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যেতে ইচ্ছুক প্রত্যেক ব্যক্তির নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তবে এ জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলা এবং মানবিক সহায়তাবাহী যানবাহনের চলাচলের উপযোগী নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, এই উদ্যোগের জন্য মেলানিয়া ট্রাম্পের প্রতি মস্কো কৃতজ্ঞ। তিনি জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

পেসকভ বলেন, যারা ওলেশকি ছেড়ে যেতে চান, তাঁদের সেই সুযোগ দেওয়া হবে।

তবে শহর ছেড়ে যাওয়া বাসিন্দাদের রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নেওয়া হবে, নাকি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পাঠানো হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।

লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম কত দিন চলবে, এমন প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি পেসকভ। তার ধারণা, এতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

মেলানিয়া ট্রাম্পের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

তার মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিকের মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে গুতেরেস আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় পর্যায়ের এই যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ ও শর্তহীন যুদ্ধবিরতির পথে একটি পদক্ষেপ হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইউক্রেনে একটি সামগ্রিক, ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের শিশুদের সহায়তা করাকে নিজের অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে নিয়েছেন মেলানিয়া ট্রাম্প। চলতি বছরের শুরুর দিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন তিনি।

গত বছর যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত শিশুদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে চিঠিও লিখেছিলেন মেলানিয়া।

তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক বেকম্যানের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ জন শিশুকে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে সহায়তা করেছেন তিনি।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘মেলানিয়া শিশুদের বাঁচাতে চান। এটাই তার মূল লক্ষ্য।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

এদিকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল ও অন্য পণ্যের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জেরে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইউক্রেন সরকারের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ঠিক সে সময়ে ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির এই সমঝোতা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন আশা দেখাচ্ছে।

দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে দিনিপ্রো নদীর তীরে অবস্থিত শহর ওলেশকি। নদীটি ইউক্রেনীয় বাহিনী এবং ওলেশকির দখলে থাকা রুশ বাহিনীর অবস্থানকে আলাদা করেছে।

শহরটিতে কয়েক মাস ধরে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট চলছে। বিদ্যুৎ নেই, তীব্র শীতে নেই ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা। এমনকি সরবরাহ লাইনের পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।

শহর থেকে বের হওয়ার সড়কগুলোতে পুঁতে রাখা হয়েছে স্থলমাইন। বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আকাশে প্রতিনিয়ত উড়ছে চালকবিহীন উড়োজাহাজ।

একসময় প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস ছিল ওলেশকিতে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই শহরটি দখল করে নেয় মস্কোর সামরিক বাহিনী।

এরপর গোলাবর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডে শহরটির বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংস হয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

২০২৩ সালের জুনে কাখোভকা বাঁধ বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ার পর ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় ওলেশকি। ওই বন্যায় শহরটির কয়েক শ বাসিন্দার মৃত্যু হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad