হবিগঞ্জ শহরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ছাত্রদলের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সংগঠক আলিফ চৌধুরী। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার বাঁ চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। দরিদ্র পরিবারের এই শিক্ষার্থীর চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করছে এনসিপি।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় এনসিপি ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় দুটি পৃথক অভিযোগ করা হয়েছে। প্রথমে এনসিপির করা মামলাটি এজাহারভুক্ত হয়। পরে রোববার ছাত্রদলের মামলাটিও এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আলিফ নবীগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের ফারুক চৌধুরী ও আতিকা বেগম চৌধুরীর ছেলে। স্থানীয় হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আলিফের কাঁধে ছিল পরিবারের বড় দায়িত্ব। তার বাবা ফারুক চৌধুরী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, বড় ভাই পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার অবস্থায় নেই। বসতভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো সম্পদ নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারের খরচ চালাতে সাহায্য করতেন আলিফ।
এনসিপি হবিগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক আবু হেনা মোস্তফা কামালের অভিযোগ, টাউন হলে এনসিপির পদযাত্রা শেষে শহরে তিন দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। প্রথমে কোর্ট মসজিদ এলাকায় এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা হলে তিনি সার্কিট হাউসে আশ্রয় নেন। এ সময় তার গাড়িচালককে মারধরের অভিযোগও করেন তিনি।
তিনি বলেন, পরে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ অন্য নেতাকর্মীদের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা হয়। এ সময় বৃন্দাবন কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাক্কির ইমন, সদস্য সচিব মাহফুজ চৌধুরী ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব নাজমুল হাসান অনিরের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, লোহার রডের আঘাতে আলিফের চোখ গুরুতর জখম হয়। তাকে রক্ষা করতে গেলে এনসিপির জেলা সদস্য সচিব মাহবুবুর বারী মুবিনও আহত হন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে সারজিস আলমসহ কয়েকজন সোনালী ব্যাংকের ভেতরে আশ্রয় নিলে সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা তারা অবরুদ্ধ ছিলেন। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।
আহত আলিফকে প্রথমে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতালের গেটের সামনেও আবার হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিনের ঘটনায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ জন আহত হন বলে জানিয়েছে এনসিপি।
ঘটনার পর মঙ্গলবারের হামলার প্রতিবাদে বুধবার বিকালে হবিগঞ্জ পৌর মাঠে পথসভার ঘোষণা দেয় এনসিপি। এর আগে আজমিরীগঞ্জে এক সমাবেশে এনসিপি নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে হবিগঞ্জ পৌর ও সদর উপজেলা বিএনপি, জেলা যুবদল ও জেলা ছাত্রদল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় প্রশাসন পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।
বিকালে এনসিপির নেতারা শহরে প্রবেশের চেষ্টা করলে বাহুবলের কামাইছড়া এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। প্রায় চার ঘণ্টা পর কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে বসে আগের দিনের হামলার ঘটনায় ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগনকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে এনসিপি। পরদিন রাতে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে হামলা ও চারটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে আলিফের বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। তার ডান চোখ খোলা থাকলেও দৃষ্টি ঝাপসা। স্পষ্টভাবে কথাও বলতে পারছেন না। বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতাকর্মী হাসপাতালে থেকে তার দেখাশোনা করছেন।
হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. সামিয়া নুজহাত বলেন, অস্ত্রোপচারের প্রায় আধা ঘণ্টা পর আলিফের জ্ঞান ফিরে আসে। তার রক্তচাপ, পালস ও অক্সিজেন স্যাচুরেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক স্বাভাবিক রয়েছে। আঘাতে তার চোখের গোলক ফেটে যায় এবং ভেতরের অংশ বাইরে বেরিয়ে আসে। পাশাপাশি চোখের ওপরের ও নিচের পাতা এবং চোখের পানি নাকে যাওয়ার ল্যাক্রিমাল ডাক্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এসব অংশ মেরামত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চোখটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সাদিকুর রহমান শিশু বলেন, ‘আলিফের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ছেলে হিসেবে ভদ্র ও শান্ত। এর আগে তার বিরুদ্ধে কোনো মারামারির অভিযোগ শুনিনি। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে সে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত। কেন্দ্রীয় নেতাদের কর্মসূচির খবর শুনে সে সেখানে গিয়েছিল।’
অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজীব আহমেদ রিংগন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আলিফ ছাত্রদলের হামলায় আহত হননি। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে মিথ্যা ছবি ও বক্তব্য প্রচার করে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, উসকানিমূলক বক্তব্যের জেরে সাধারণ ছাত্র-জনতা হামলা করেছে, ছাত্রদল নয়। বরং এনসিপি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের করা দুটি মামলাই থানায় এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।


