সৌদি আরবের সরকারি প্রতিষ্ঠান আরামকোর পাঠানো একটি ত্রুটিপূর্ণ এলএনজি কার্গো নিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে জাহাজ বাছাই ও দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাত বছর আগে এলএনজি আমদানির শুরুর দিকেও ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আরামকোর কার্গোটি গ্রহণ করাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় এটি ফেরত পাঠানো হয়। টার্মিনাল দুটির দায়িত্বে থাকা সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জি–কোনো প্রতিষ্ঠানই জাহাজটি নিতে রাজি হয়নি।
তবে বিমা না থাকার কারণে জাহাজটি ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে যে খবর রটেছিল, তা সঠিক নয় বলে নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা।
আরামকোর পাঠানো ‘আল হামরা’ নামের এই জাহাজটি প্রায় ২৯ বছরের পুরোনো। এতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মান সঠিকভাবে মানা হয়নি, যা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
সাত বছর পর হঠাৎ কীভাবে এমন একটি জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছে গেল, সে বিষয়ে কোনো কর্মকর্তাই দায় নিতে রাজি হননি। কারিগরি ত্রুটির কথা অনেকে স্বীকার করলেও ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি।
পেট্রোবাংলার ওই কর্মকর্তা জানান, ‘বাংলাদেশ যখন এলএনজি আমদানি শুরু করে, তখন একদম শুরুর দিকে এমন একটি জাহাজ এসেছিল। সে সময় মূল ইউনিটে বেশ সমস্যা তৈরি হয়। এরপর থেকে গত সাত বছরে দেশে আর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ আসেনি।’
বাংলাদেশ ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে। শুরুতে একটি মাত্র টার্মিনাল দিয়ে কাজ চললেও পরে দ্বিতীয় আরেকটি টার্মিনাল চালু করা হয়। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার তৃতীয় একটি টার্মিনালের পরিকল্পনা করলেও অন্তর্বর্তী সরকার এসে তা বাতিল করে দেয়।
সম্প্রতি এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ’তে কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কয়েক দিন সেটির কাজ বন্ধ ছিল। তাই তারা এবার আর নতুন কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।
এলএনজি মূলত মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল হিসেবে আসে। সমুদ্রের পানির তাপ ব্যবহার করে একে আবার গ্যাসে রূপান্তর করা হয় এবং জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় একটি কার্গো যুক্ত হওয়ার পর সামিটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। রোববার আরও একটি কার্গো আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে সামিট টার্মিনাল থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট এবং দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ১৬২ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি চাহিদার বিপরীতে মোট সরবরাহ মিলছে মাত্র ২১৯ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট।
আরামকোর কার্গো ফেরত যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে। এতে কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাধারণ বাসাবাড়ির গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, আরামকো’র সঙ্গে একটি পারস্পরিক সমঝোতা হয়েছে। তাই কেউ কারও কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবে না।
তিনি বলেন, ‘আরামকো এই কার্গোটি কাছের কোনো দেশে পাঠাবে এবং আমাদের জন্য একটি নতুন কার্গো পাঠাবে।’
তবে কার্গোটিতে কোনো ত্রুটি ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, এক্সিলারেট এনার্জি তাদের নিজেদের সমস্যার কারণেই জাহাজটি গ্রহণ করতে চায়নি।
অন্যদিকে, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপ-মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, খারাপ আবহাওয়ার কারণে গ্যাস খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় জাহাজটি ফেরত গেছে।
আর পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক দীন মোহাম্মদ জানান, জাহাজ স্থানান্তর ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার শর্ত পূরণ না হওয়ায় এটি ফেরত পাঠানো হয়েছে।
প্রায় ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘আল হামরা’ ১১ আগস্ট মধ্যরাতে মহেশখালী উপকূলে এসে পৌঁছেছিল।
শিল্প উৎপাদনে বড় ধাক্কা
এদিকে, গ্যাসের তীব্র সংকটে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ দেশের বড় বড় শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন থমকে গেছে।
গাজীপুরের ভোগড়া, কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর ও কালিয়াকৈরে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু পোশাক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আর অনেকগুলো আধা-চালু অবস্থায় রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, মূল লাইন থেকেই চাপ কম থাকায় গাজীপুরে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে যেসব কারখানা পাইপলাইনের একদম শেষ মাথায়, সেগুলোতে গ্যাসই পৌঁছাচ্ছে না।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, গাজীপুরের ৩ হাজারের বেশি কারখানার মধ্যে ৪০০ থেকে ৪৫০টি কারখানা এই সংকটে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গ্যাসের কম চাপের কারণে বয়লার, ডাইং ও টেক্সটাইলের কাজ বন্ধ থাকছে। ফলে সময়মতো রপ্তানি পণ্য ডেলিভারি দিতে না পেরে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি ও অর্ডার হারানোর ভয়ে আছেন মালিকরা। আর চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা।
স্মাইল অ্যাপারেলসের মালিক মোহাম্মদ সবুর হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও ব্যাংকের কিস্তি থেমে নেই। অনেক ব্যবসাই এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে।’
লিরিক গার্মেন্টসের মালিক মোহাম্মদ সেলিম জানান, বয়লার ও ডাইংনির্ভর কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে। জুলাই মাসে এই সংকটের কারণে গাজীপুরের প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা চার দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
তবে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, সব কারখানার অবস্থা একরকম নয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, কিছু কারখানা সাময়িকভাবে কাজ কমিয়েছে বা অতিরিক্ত শিফট বন্ধ রেখেছে, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনের বাইরে যায়নি।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর প্রতিনিধি দিল আফরোজা)


