একসময় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট, যা ‘সোনালী আঁশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্যে কিছুটা ভাটা পড়লেও পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও পাটের চাহিদা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলায় পাটের বাম্পার ফলন কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম থাকা এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও পরিচর্যার ফলে এ বছর কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলন পেয়েছেন চাষিরা। এখন উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ‘সোনালী আঁশ’ আবারও এ অঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।
এ বছর পাটের ফলনের চিত্র দেখে উচ্ছ্বসিত কৃষকেরা। কয়েক বছর পর এমন ফলন পাওয়ায় তাদের মুখে ফিরেছে স্বস্তি ও আনন্দের হাসি। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভালো ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিয়েও রয়েছে তাদের চরম উদ্বেগ। কৃষকদের প্রত্যাশা, বাজারে পাটের দাম সন্তোষজনক থাকলে চলতি মৌসুমে লোকসানের আশঙ্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে এবং সোনালী আঁশ আবারও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে।
ধনবাড়ী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে ধনবাড়ী উপজেলায় মোট ১০০ শত ১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে দেশি ১০ হেক্টর তোষা ৮০ হেক্টর কেনাফ ২০ হেক্টর।
সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ ভাগ থেকে বৈশাখ মাসজুড়ে (মার্চের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত) পাটের বীজ বপন করা হয়। বীজ বপনের প্রায় ১০০ থেকে ১২০ দিন পর, অর্থাৎ সাড়ে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পাট কাটার উপযোগী হয়ে ওঠে। সে অনুযায়ী আষাঢ়ের শেষ ভাগ থেকে শ্রাবণ মাস (জুলাই-আগস্ট) পর্যন্ত চলে পাট কাটার মৌসুম।
পরে খাল, বিল বা নদীর পানিতে ১০ থেকে ১৫ দিন পাট জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়ানো হয়। আঁশ ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে কৃষকরা তা বাজারজাত করেন। বর্তমানে ধনবাড়ী পৌর এলাকার ও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠে মাঠে চলছে পাট কাটার ব্যস্ততা। কোথাও কৃষকেরা পাট কেটে আঁটি বেঁধে জাগ দিচ্ছেন, কোথাও পানির নিচ থেকে জাগ তুলে আঁশ ছাড়াচ্ছেন। আবার গ্রামের রাস্তার ধারে ও বাড়ির আঙিনায় সারি সারি শুকাতে দেওয়া হয়েছে সোনালী আঁশ। পুরো জনপদজুড়ে এখন পাট ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
ধনবাড়ী পৌর শহরে টাকুরিয়া গ্রামের কৃষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। সময়মতো বৃষ্টি হয়েছে, তাই পাটের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। আমি দুই পাখি জমিতে পাট চাষ করছি লাম আমার খরচ হয়েছে ৫৫ হাজার টাকা বর্তমানে এখন পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকা, যা আমাদের খরচ তুলনায় অনেক কম এই খরচে আমার কামরা খরচ উঠবে না। এখন শুধু ভালো দাম পেলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
বাজিতপুর গ্রামের কৃষক রিপন ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাটের গাছ লম্বা হয়েছে, আঁশও ভালো হয়েছে। যদি বাজারে ভালো দাম থাকে, তাহলে পাট চাষে লাভ হবে।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা পাট চাষে সার, উন্নতমানের বীজ, আগাছা দমন, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবুও অনুকূল আবহাওয়া ও বাম্পার ফলনের কারণে তারা লাভের আশা করছেন। তবে কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে পাটের দাম কমে গেলে বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। তাই উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সোনালী আঁশের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে কিছু এলাকায় এখনো জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানির সংকট রয়েছে। অনেক কৃষক দূরের খাল বা নদীতে পাট নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। কৃষকদের দাবি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং আধুনিক পাট প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং আঁশের মান আরও উন্নত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার কারণে পাটের গুরুত্ব আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পাটের চাহিদা আরও বাড়বে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাটভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে।
ধনবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে পাট চাষের জন্য আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের উন্নত জাতের পাটের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সময়মতো পরিচর্যার কারণে এ বছর ফলন ও আঁশের গুণগত মান দুটি ভালো হয়েছে। আশা করি কৃষক ভালো দাম পাবে।


