‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতা ঘটিয়ে জনমনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। পুলিশের আশঙ্কা, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটি বৃহস্পতিবার বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার রায়ের দিন ধার্য করার কথা বৃহস্পতিবার। শেখ হাসিনা এই মামলার প্রধান আসামি।
আর রায়ের তারিখ ঘোষণার এই দিন ঘিরেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঢাকা লকডাউন কর্মসূচি দেয়। যা সফল করতেই এ ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে বলে মনে করে পুলিশ ও গোয়েন্দারা।
পলাতক শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতারা ভারত ও অন্যান্য দেশে বসে বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের উসকানি দিয়ে এসব নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
রায় ঘোষণার দিন ধার্য করাকে কেন্দ্র উত্তেজনাকর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বিচারকদের গাড়ি-বাড়ি টার্গেট হতে পারে। এ কারণে বুধবার জাজেজ লাউঞ্জে ২১ জন বিচারকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা থেকে নিরাপত্তাবলয় বাড়ানো হয়।
একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া নানা আশঙ্কা থেকে কাকরাইলে বিচারকদের বাসভবনের চারপাশে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারকদের গ্রামের বাড়িতেও নজরদারি করা হচ্ছে।
পুলিশের রমনা জোনের ডিসি মাসুদুল আলম বলেছেন, জাজেজ কোয়ার্টার ও প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে। নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের চারপাশেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কয়েকদিন ধরে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে।
গত কয়েকদিনের বিচ্ছিন্ন ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রেক্ষিতে নাশকতার আশঙ্কা আরো বেড়েছে। আশঙ্কা থেকে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনায় পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা ও আশপাশের জেলায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্স থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সবকিছু তদারকি করছেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও দেওয়া হচ্ছে নির্দেশনা।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নাশকতা করার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’
ডিএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৩ নভেম্বর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যারা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সর্বোচ্চ আইন প্রয়োগ করে তাদেরকে দমন করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে রয়েছেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই।’
ডিএমপির তথ্যমতে, ১ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় প্রায় ২০টি ককটেল বিস্ফোরণ ও গত দুই দিনে প্রায় ১০টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার আরও দুটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। আশুলিয়া ও ঢাকার ধোলাইপাড় বাসদুটি পড়ানো হয়।
এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা দায়ের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী ছাড়াও ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অন্তত সারা দেশে ১২টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়ি এলাকায় আলম পরিবহন নামে একটি বাসে আগুনের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় এক হেলপারের মৃত্যু হয়েছে।
ভারতের কলকাতা, দিল্লি ছাড়াও একাধিক দেশ থেকে ১৩ নভেম্বর ঘিরে নানা ধরনের প্রচারণা ও নির্দেশনা চলছে, আছে উসকানি। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পৃথক নির্দেশনা হোয়াটআপ ও টেলিগ্রামে একাধিক গ্রুপে সমন্বয় করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দিসহ একাধিক নেতা লকডাউনে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও নেতাকর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ দাবি করে আওয়ামী লীগ কর্মসূচি দিলেও কলকাতায় অবস্থানরত একাধিক নেতা দাবি করছেন, তারা কোনো রক্তপাত ও প্রাণহানি চান না। নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে রাস্তায় আন্দোলন ও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে সরকারবিরোধী জনসমর্থন তৈরি তাদের লক্ষ্য। এজন্য রাজধানীকে তারা টার্গেট করেছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের মধ্যদিয়ে ঘটনার শুরু হলেও দুর্বৃত্তরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা টার্গেট করতে পারে। ওইসব স্থাপনায় ককটেল ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টার আশঙ্কা রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার রায়ের দিন ধার্য করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বিচারকদের গাড়ি-বাড়ি টার্গেট হতে পারে।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় বৃহস্পতিবার সেনা মোতায়েন চেয়ে সেনাসদরে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্রাইবুনালে সেনা মোতায়েন চেয়ে রেজিস্ট্রার জেনালের অফিস থেকে সেনাসদর দপ্তরে বুধবার চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, লকডাউন ঠেকাতে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির মাঠে নামার ঘোষণা দেওয়ায় সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অনেকে।


