নিউইয়র্কের ফ্যানাটিকস ফেস্টের মঞ্চে শুক্রবার লিওনেল মেসি যখন এলেন, দর্শকদের করতালি ছাপিয়ে উঁচিয়ে ধরা মোবাইল ফোনের সংখ্যাই ছিল বেশি। ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে সামনে দেখার মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করতে চেয়েছিলেন সবাই।
হারিয়ে যাওয়ার আগেই ধরে রাখার এই আকুতিই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবারের আর্জেন্টিনা ও স্পেন মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্তর্নিহিত সুর। ম্যাচটি কেবল কৌশলের দ্বৈরথ নয়, ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেখানে ইতিহাস গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে, ১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল সেখানে ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
চলতি সপ্তাহে মেসি ও ইয়ামালের একটি পুরোনো ছবি নতুন করে সামনে আসায় এই রূপক আরও স্পষ্ট হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, তরুণ মেসি কোলে নিয়ে আছেন এক শিশুকে, যে আজ ইয়ামাল হয়ে উঠেছে। মঞ্চে স্বয়ং টম ব্র্যাডিও প্রসঙ্গটি তোলেন।
ছবিটি দেখে মেসির প্রতিক্রিয়া ছিল সহজ, ‘দারুণ এক ছবি।’ তবে এর পেছনের বাস্তবতা গভীর। ইয়ামালের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মেসির সঙ্গে তার তুলনা চলছে। এবার ট্রফির লড়াইয়ে একই মাঠে মুখোমুখি হচ্ছেন দুজনে।
স্পেনের অধিনায়ক ও সাবেক ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রি এই তুলনা এড়িয়ে যাননি। তিনি মেসিকে ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে রদ্রি ও কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দুজনেই চান না ইয়ামালের ওপর বাড়তি চাপ পড়ুক। অনুশীলনে ঊরুতে ব্যান্ডেজ বাঁধা ইয়ামালের চোটের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘লামিনকে তার নিজের মতোই খেলতে হবে। সে ভালো আছে, সম্পূর্ণ সুস্থ আছে।’
দুই পথ, এক মঞ্চ
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে স্পেনের মূল অস্ত্র ছিল নিয়ন্ত্রণ। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ধাক্কা খাওয়ার পর থেকে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লা রোজা। গোলরক্ষক উনাই সিমোনের নৈপুণ্য ও বল নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলে সাত ম্যাচে তারা গোল খেয়েছে মাত্র একটি।
স্পেন অধিনায়ক রদ্রি বিষয়টিকে পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সাফল্য হিসেবে দেখছেন, যার শুরু ২০২৩ সালের নেশনস লিগ জয় ও পরবর্তী সময় ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মাধ্যমে। দলটির খেলার গতি ও কৌশল নিয়ে রদ্রি বলেন, ‘আমরা ধাপে ধাপে এগিয়েছি। রোববারের ম্যাচটি সম্পূর্ণ আলাদা হবে। এটি শারীরিক শক্তির লড়াই হতে যাচ্ছে, আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’
আর্জেন্টিনার ফাইনালের পথটি ছিল বেশ কঠিন ও নাটকীয়। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা চলতি টুর্নামেন্টে একমাত্র অপরাজিত দল হলেও মিশর ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের ঘুরে দাঁড়িয়ে জিততে হয়েছে। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দুটি গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে।
শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে দলের খিদে কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের আবেগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষকে উদযাপনে মাততে দেখা, তাদের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।’
কাতার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের নায়ক গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ জানান, ২০২২ সালের চেয়ে এবারের আসর তাকে বেশি আবেগপ্রবণ করেছে। দলের দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমাদের অর্জনগুলো নিয়ে ভাবলে মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলি।’
আসল লড়াই যেখানে
ট্রফির বাইরেও এই ম্যাচে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর কোনো দেশ টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ৩৯ বছর বয়সে এসেও মেসির ফাইনালে খেলার যোগ্যতা নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘এই বয়সে ফাইনালে পৌঁছানো অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার।’
আর্জেন্টিনা জিতলে ফুটবলের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে মেসির অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে। একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জয়ের মাধ্যমে স্কালোনির দল আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন এক আধিপত্য কায়েম করবে, যা খুব কম দলই পেরেছে।
স্পেন জিতলে ১৬ বছর পর এটি হবে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। এই জয় ইয়ামালকে মেসির উত্তরসূরি হিসেবে নয়, ফুটবলের নতুন যুগের প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ইয়ামালকে এই চাপ থেকে দূরে রাখতে পুরো সপ্তাহ সতর্ক ছিলেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে। তবে এই কিশোরের হাত ধরে স্পেন ট্রফি জিতলে মাঠের পারফরম্যান্সই সব কথা বলবে।
দলের উত্তরসূরিদের জন্য কী বার্তা থাকবে, এমন প্রশ্নে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক মার্টিনেজ বলেন, ‘আমাদের দলের খেলোয়াড়রা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে। আর্জেন্টিনার মানুষ আমাদের কঠোর পরিশ্রমী হিসেবে মনে রাখবে, যারা কখনো হার মানে না।’
স্পেনের রদ্রি নিজের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা একটি গোছানো দল, ঠিক এই কারণেই আমরা ফাইনালে উঠেছি।’
ফাইনালের ফলাফল যা-ই হোক, রোববারের ম্যাচটি শুধু চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করবে না। এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দূতের শেষ অধ্যায় লিখবে, নাকি নতুন এক মহাতারকার জয়যাত্রা শুরু করবে, তা ঠিক করে দেবে।


