ইরানের হামলাত জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহতের জেরে তেহরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে তারা জানায়, জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহতের পাশাপাশি একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
সবশেষ দুই সেনার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ৪২০ জনের বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘তাদের (মার্কিন সেনা) আত্মত্যাগ যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশটিতে বিমান হামলা শুরু করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করা এবং শুক্রবার রাতে জর্ডানে মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর হামলাকারী ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসকে (আইআরজিসি) দ্রুত শাস্তি দিতে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
তবে হামলার বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড।
এদিকে ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থাও দেশটিতে মার্কিন হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক এলাকার কাছে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। তবে সেখানে কোনো হতাহত বা অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
প্রায় এক মাস আগে সই করা অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে কার্যত ভেঙে পড়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে।
সেন্ট কম জানায়, শুক্রবার ইরানের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্য অবকাঠামোয় হামলা চালানোর পর শনিবার ইরান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো এবং জর্ডানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই সম্পূর্ণ মূল্যহীন এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন।’
অবলিম্বে ইরানে হামলা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় মূল্য ও আরও অপমানের মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এদিকে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন, তা এখনো রহস্যাবৃত রয়েছে।
শনিবার কুয়েতেও টানা হামলা হয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান (ড্রোন) প্রতিহত করেছে।
হামলার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করার সময় কয়েকজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী এবং তেল খাতের কর্মী আহত হয়েছেন বলেও কুয়েতি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, তারা কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক সহায়তাকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে এবং আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি রাডার স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
পরে কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানায়, ইরানের একাধিক হামলায় তাদের একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো অবস্থান করছিল, সেখানেও আইআরজিসি হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে একটি গোয়েন্দা তথ্যকেন্দ্রকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, শনিবার ভোরে জর্ডানের আল আজরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলা চালিয়ে অন্তত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং আরও তিনটি আকাশযান ধ্বংস করেছে আইআরজিসি।
শনিবার ভোরে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আল খারজ ও ইয়ানবুর বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সতর্কবার্তা জারি করে।
রিয়াদের পূর্বদিকে অবস্থিত আল খারজের একটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করেন। অন্যদিকে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবুতে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল রয়েছে।
ঘটনা সম্পর্কে অবহিত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিন মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের ওপর ইরানের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ওই সতর্কতা জারি করা হয়।
অবশ্য ইরান কিংবা সৌদি আরব সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়া এবং অপ্রত্যাশিতভাবে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে শনিবার বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
সতর্কবার্তায় বলা হয়, উড়োজাহাজ চলাচল বাতিল এবং বিভিন্ন সময়ে আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ভ্রমণ ব্যাহত হতে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকম জানিয়েছিল, তারা ইরানের নজরদারি স্থাপনা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় হরমুজ প্রণালিসংলগ্ন ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
এসব হামলায় দুটি সেতু এবং একটি সড়ক সুড়ঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শনিবার জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
উভয় পক্ষই জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা একটি নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, প্রণালিতে চলাচলের জন্য তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
শনিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে সব হামলা ও সামুদ্রিক চলাচলে হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি কোনো শর্ত বা মাশুল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে যৌথ হামলা শুরু করলে এই সংঘাতের সূচনা হয়।
এতে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরানি বাহিনী। বিশ্ববাজারে তেলের প্রবাহ কমে আসায় হুট করেই জ্বালানির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।


