মেট্রোরেলের নকশার ত্রুটি ও নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাডের কারণে সেটি খুলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
ফাওজুল কবির খান বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কমিটির সদস্যরা দেখতে পেয়েছেন যে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
বিয়ারিং প্যাড খুলে দুর্ঘটনা এবং তাতে এক পথচারীর মৃত্যুর দুই মাসেরও বেশি সময় পর সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক কারণ জানানো হলো।
তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দেশের বাইরের ল্যাবরেটরিতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলের লাইনে বিয়ারিং প্যাডগুলো কিছুটা ঢালু অবস্থায় (শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ স্লোপ) সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর কিছুটা প্রভাব রয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।’
গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে নিহত হন আবুল কালাম (৩৫) নামে এক ব্যক্তি।
দুর্ঘটনার দিনই সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম এবং ডিএমটিসিএল-এর লাইন-৫-এর প্রকল্প পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব।
পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এছাড়াও কমিটি আরও দুই বিশেষজ্ঞ সদস্যকে কো-অপ্ট করে।
তারা হলেন—বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত এবং অধ্যাপক ড. রাকিব আহসান।
এছাড়াও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের যোগসাজশ আছে কিনা তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করার জন্য ফরেনসিক প্রতিনিধি হিসেবে জনাব মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, এসএসপি, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশকে তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সেই কমিটির প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যই সাংবাদিকদের সামনে বৃহস্পতিবার তুলে ধরলেন সড়ক উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনটির উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট অবস্থিত। দেখা গেছে, ভায়াডাক্টের এলাইনমেন্টের সোজা অংশ ও বৃত্তাকার অংশের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রানজিশন কার্ভ ব্যবহার করা হয়নি।
কমিটির অনুসন্ধানে মেট্রোরেলের এই এলাইনমেন্টের নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কার্ভ এলাইনমেন্টের জন্য আলাদাভাবে মডেলিং ও এনালাইসিস করা হয়নি। সোজা এলাইনমেন্টের মডেলিং ও এনালাইসিস দিয়েই কার্ভ এলাইনমেন্টের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।
কমিটি ট্রেন চলাকালে পরিচালিত কম্পন পরিমাপে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারগুলোয় অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি পেয়েছে। কার্ভ এলাইনমেন্টে নকশায় সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে এ অংশে অযাচিত পার্শ্ব বল এবং সংশ্লিষ্ট কম্পনের উদ্ভব হয়েছে, যার সঙ্গে বিয়ারিং প্যাডের বিচ্যুতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কার্ভ এলাইমেন্ট এবং নিকটস্থ স্টেশনে রেলট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও মধ্যবর্তী দুর্ঘটনার স্থান সংশ্লিষ্ট ট্রাকের জায়গায় রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, ‘ধারণা করা হয় যে, এসব জায়গায় ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ভাইব্রেশন কমানো সম্ভব হতো। তবে কমিটি ঘটনার সাথে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসাজশ পায়নি।’
তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং প্রত্যক্ষদর্শী, ট্রেন চালক, অপারেটর, মেট্রোরেল কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেয়। এছাড়াও বিয়ারিং প্যাড প্রস্তুতকারক কোম্পানি, ঠিকাদার ও ডিজাইন পরামর্শকদের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়।
কমিটি প্রাপ্ত ডিজাইন ডকুমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত ও প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
কমিটির সদস্যরা মেট্রোরেল স্ট্রাকচারের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং বিচ্যুত বিয়ারিং প্যডের ল্যাবরেটরি টেস্ট, ট্রেন চলাকালীন সময়ে ভাইব্রেশন পরিমাপসহ গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। এ দীর্ঘ সময়ে তদন্ত কমিটি ১০টি সভা করে প্রাপ্ত সব তথ্য বিশ্লেষণ করে এরপরই তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে।


