দিনশেষে পশ্চিম আকাশ যখন লালচে আভায় রঙিন হয়ে ওঠে, তখন সেই আলো নেমে আসে বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে। ঢেউয়ের মৃদু দোলায় সূর্যের শেষ আলো ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। দূরে ফুটে থাকা লাল শাপলা, মাথার ওপর মুক্ত আকাশ, আর মাঝখান দিয়ে সাপের মতো বেঁকে যাওয়া একটি সড়ক। সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে এক জীবন্ত জলরঙের ছবি।
এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মেলে নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী বিলে। প্রকৃতি, কৃষি আর সম্ভাবনাময় পর্যটনের অনন্য সমন্বয়ে হাঁসাইগাড়ী বিল আজ নওগাঁর এক অমূল্য সম্পদ। প্রয়োজন কেবল সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটকবান্ধব কিছু উদ্যোগ। সঠিক পরিচর্যা পেলে একদিন এই বিল শুধু নওগাঁ নয়, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি লাভ করতে পারে।

বর্ষা এলেই নতুন প্রাণ ফিরে পায় এই বিল। চারদিকে শুধু অথৈ জলরাশি, মাঝখানে পাকা সড়ক আর দু’পাশে দৃষ্টিসীমা ছাপিয়ে যাওয়া পানির বিস্তার। শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে কিংবা পরিবারের সঙ্গে কিছু নির্ভার সময় কাটাতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন নানা বয়সের মানুষ। কেউ প্রকৃতির রূপ ক্যামেরাবন্দি করেন, কেউ নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, আবার কেউ সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যান।
নওগাঁ জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাঁসাইগাড়ী বিলে পৌঁছানোও সহজ। শহরের গোস্তহাটির মোড় থেকে অল্প সময়ের যাত্রায় মিলবে এই অনিন্দ্য সুন্দর জলাভূমির দেখা।

শুধু সৌন্দর্য নয়, হাঁসাইগাড়ী বিল এ অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। বছরের দীর্ঘ সময় পানিতে পরিপূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে বদলে যায় এর রূপ। তখন বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে শুরু হয় ইরি-বোরো ধান, সরিষা, আলুসহ বিভিন্ন রবিশস্যের আবাদ। এক ঋতুতে যেখানে জলরাশির রাজত্ব, অন্য ঋতুতে সেখানে সবুজ ফসলের সমারোহ প্রকৃতি যেন নিজেই ঋতুর সঙ্গে বদলে দেয় তার সাজ।
একসময় এই এলাকার মানুষের যাতায়াত ছিল অত্যন্ত দুর্ভোগপূর্ণ। বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে কাদা মাড়িয়ে চলাই ছিল একমাত্র ভরসা। ২০১০ সালে প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিকারপুর ইউনিয়নের খামারবাড়ী মোড় থেকে হাঁসাইগাড়ী ইউনিয়নের কাটখৈইর বাজার পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের পর বদলে যায় পুরো চিত্র। সহজ হয় যোগাযোগ, গতিশীল হয় অর্থনীতি, আর সবার চোখে ধরা পড়ে বিলের লুকিয়ে থাকা অপার সৌন্দর্য। সেই থেকেই ধীরে ধীরে হাঁসাইগাড়ী বিল ভ্রমণপ্রেমীদের পরিচিত গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

নওগাঁ শহরের চকবাড়িয়া মহল্লা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মাজেদুর রহমান লিটন বলেন, ‘বর্ষায় হাঁসাইগাড়ী বিল যেন অন্য এক পৃথিবী। মাঝখানে চলে যাওয়া সড়ক আর দুই পাশে বিশাল জলরাশি সত্যিই অসাধারণ। এখানে এসে মনে হয় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।
নৌকায় বিল ঘুরে দেখা দর্শনার্থী সাব্বির হোসেন, নিলুফা খাতুন ও তাহমিদ হোসেনের অভিমত, এখানকার পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর। লাল শাপলা আর খোলা জলরাশি, বিলটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে বসার জন্য কিছু বেঞ্চ, ছাউনি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকলে দর্শনার্থীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারতেন।

কৃষির দিক থেকেও হাঁসাইগাড়ী বিলের গুরুত্ব কম নয়। নওগাঁ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর এ বিল থেকে প্রায় ১৮ হাজার ৪১৩ টন বোরো ধান, ৭৬০ টন সরিষা এবং ১৩৪ টন আলু উৎপাদিত হয়। কৃষি বিভাগের পরামর্শে, উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ধানের পাশাপাশি অন্যান্য রবিশস্যের আবাদও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এদিকে হাঁসাইগাড়ী বিলকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীন মাহমুদ বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে হাঁসাইগাড়ী বিল ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পর্যটকদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি একটি সেলফি পয়েন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ এলাকাকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।

