রোহিঙ্গা কৌশলে বড় পরিবর্তন: নিরাপত্তায় গুরুত্ব

রোহিঙ্গা কৌশলে বড় পরিবর্তন: নিরাপত্তায় গুরুত্ব
Advertisement
Advertisement

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করেছে। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এই সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপ।

রোববার প্রকাশিত এক সরকারি গেজেট অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

এই কমিটিকে একটি ব্যাপক ভিত্তিক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলোর সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই গেজেট জারি করা হলো। চীন সফরকালে সে দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল।

নিরাপত্তা-নির্ভর কমিটি

প্রধানমন্ত্রী এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, আর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) থাকবেন প্রধান সমন্বয়কারী। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে সদস্য-সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী; অর্থ, পরিকল্পনা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ; পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালকগণ।

ডিজিএফআই এই কমিটিকে সাচিবিক ও প্রশাসনিক সহায়তাও প্রদান করবে।

কমিটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পররাষ্ট্র সচিবের অনুপস্থিতি। তাকে এই কমিটিতে রাখা হয়নি। যদিও কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দেশের এই শীর্ষ কূটনীতিকের অনুপস্থিতি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে অন্যদের মতে, নীতিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভবত পৃথক কোনো ব্যবস্থা তৈরি করবে।

জাতীয় কর্মপরিকল্পনা

কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু সংক্রান্ত একটি ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এসব দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত আইন প্রয়োগকারী ও অন্যান্য সংস্থার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা।

আরও পড়ুন

প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতাও এই কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, এই কমিটির গঠন কাঠামো ইঙ্গিত করে সরকার রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি এর নিরাপত্তা সংক্রান্ত দিকগুলোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

তারা উদ্বেগের দুটি প্রধান ক্ষেত্রও চিহ্নিত করেছেন: অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।

প্রধান অভ্যন্তরীণ উদ্বেগটি হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অস্থিরতা যাতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তা প্রতিরোধ করা। এছাড়া নিরাপত্তা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের ভেতরে উগ্রবাদের ঝুঁকি, আন্তঃসীমান্ত অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান এবং মানব পাচারের মতো বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ করছে।

কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ মিয়ানমারের মধ্যকার সংঘাতের সাথে দিন দিন আরও বেশি জড়িয়ে পড়ছে, যা বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

কৌশলগত পরিবর্তন

সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহফুজুর রহমান এই কমিটি গঠনকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা রোহিঙ্গা ইস্যুকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রমাণ বহন করে।

টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, ‘এই কমিটি এটাই প্রমাণ করে যে সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।‘

কমিটিটি নিরাপত্তা সংস্থা-নির্ভর—এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এর গঠন কাঠামোকে মিয়ানমারের সামরিক-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং তাদের কৌশলগত সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, “প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারকে প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে। অনেক সময় মিয়ানমার পক্ষের অংশীজনরা বুঝতে পারতেন না যে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এই ব্যবস্থার ফলে সেই অস্পষ্টতা দূর হওয়া উচিত।”

তবে মাহফুজুর রহমান যুক্তি দেন, অর্থনৈতিক বিবেচনাগুলোকেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ করা উচিত।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জীবিকা ও অর্থনৈতিক সুযোগের উন্নতি হলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা বাড়বে।

যদি রাখাইনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়, তবে সংকট সমাধানের সম্ভাবনা অনেক বেশি হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হলে সরকারের সামগ্রিক উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, সুশীল সমাজ এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গবেষণায় যুক্ত শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে কিছু সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সরকারের এই প্রচেষ্টায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মাত্রা যোগ হতে পারত।

নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

এই নতুন কমিটি রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের একটি পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। এর আগের প্রচেষ্টাগুলোতে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার সংমিশ্রণ ছিল। তবে সর্বশেষ এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা, সমন্বয় এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘায়িত রূপ বিবেচনা করলে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য শেষ পর্যন্ত জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জোরালো কূটনীতি, রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর