সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রায় ১০ বছর পর অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার এবং পরে জামিন স্থগিতের ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছে তার পরিবার।
মামলার এজাহারে হাফিজুরের নাম নেই উল্লেখ করে তার পরিবার দাবি করে, দীর্ঘদিনের তদন্ত ও একাধিক দফা জিজ্ঞাসাবাদেও তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি তনুর মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা আলামতের সঙ্গে হাফিজুরের ডিএনএরও মিল পাওয়া যায়নি।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করেন হাফিজুরের আইনজীবী এম. সরোয়ার হোসেন। এ সময় হাফিজুরের স্ত্রী রওশন আরা লিপি ও তাদের তিন সন্তান উপস্থিত ছিলেন।
আইনজীবী জানান, ২০১৬ সালের ১৩ ও ১৮ মার্চ তনুর সঙ্গে হাফিজুরের ফোনে যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তে আসার পর গত ২১ এপ্রিল তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
তবে ২৪ জুন আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তনুর মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা আলামতের সঙ্গে হাফিজুরের ডিএনএর কোনো মিল পাওয়া যায়নি বলে দাবি পরিবারটির।
তনুর সঙ্গে ফোনে কথা কেন
আইনজীবী সরোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের স্ট্যাটিক সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। হাফিজুর ওই অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য ১৩ মার্চ তনুর সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। ১৮ মার্চও তাদের কথা হয়। তখন তনু জানান, তিনি নাট্যদলের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে আছেন এবং অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন না।
এর দুই দিন পর, ২০ মার্চ সন্ধ্যায় তনু নিখোঁজ হন। ওই রাতেই কুমিল্লা সেনানিবাসের আলিপুর এলাকার পাওয়ার হাউসের কাছে জঙ্গল থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তবে এই ঘটনার সঙ্গে হাফিজুরের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তার পরিবার দাবি করেছে, ওই রাতে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনেই ছিলেন।
ডিএনএ পরীক্ষার ফল নিয়ে প্রশ্ন
তনু হত্যা মামলার তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। তবে তখন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএর সঙ্গে ওই নমুনার মিল পরীক্ষা করা হয়নি।
চলতি বছরের ৬ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার জন্য আদালতের অনুমতি চান। তাদের মধ্যে হাফিজুর রহমান ছাড়াও ছিলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম।
আদালত তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেন। এরপর হাফিজুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
তখন তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ডিএনএ ম্যাচ করার কাজ শুরু হয়েছে এবং ফল পাওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
জামিনের পর আবার কারাগারে
হাফিজুরের গ্রেপ্তার ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তার পরিবার।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়। ৪ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরুদ্ধে আবেদন করলে ৬ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার জজ হাইকোর্টের জামিন স্থগিত করেন এবং তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
পরিবারের দাবি, আদালতের ওই নির্দেশের পর হাফিজুর পালিয়ে যাননি। তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা কারাগারে রয়েছেন। এপ্রিলেও গ্রেপ্তারের পর তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
‘তদন্তের চাপ কমাতেই গ্রেপ্তার’
সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেন বলেন, হাফিজুরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে তাকে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তার দাবি, তনু হত্যার পর বিভিন্ন পর্যায়ে হাফিজুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষাতেও তার সঙ্গে তনুর মরদেহ থেকে পাওয়া আলামতের মিল পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরোয়ার হোসেন দাবি করেন, মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নিতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তার ধারণা, তদন্তের চাপ কমাতেই হাফিজুরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হাফিজুরের স্ত্রী রওশন আরা বলেন, ‘সেই রাতে আমার স্বামী বাসাতেই ছিলেন।’
১০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু কুমিল্লা সেনানিবাসে টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে পুলিশ, পরে ডিবি ও সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে। বর্তমানে তদন্ত করছে পিবিআই। এ সময়ে একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করলেও হত্যার কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়নি।
চলতি বছরের এপ্রিলে হাফিজুরকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর মামলার তদন্তে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়। তবে গ্রেপ্তারের পর থেকেই তার পরিবার ও আইনজীবী গ্রেপ্তারের যৌক্তিকতা এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।


