ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা কিংবা নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ থেকে মানুষের জীবন, সম্পদ ও গৃহপালিত প্রাণী রক্ষায় ২০১৮ সালে দেশের ৪৫০টি স্থানে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও টেন্ডার জটিলতা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, প্রশাসনিক ধীরগতি ও বাস্তবায়ন অদক্ষতায় আট বছরেও তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। বরং ব্যয় কমিয়ে, নির্মাণের লক্ষ্য প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এবং মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী আগামী বুধবার অনুষ্ঠেয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ৯০৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তৃতীয় সংশোধনীতে সেই ব্যয় কমিয়ে ৮৮০ কোটি ২২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় কমছে ১ হাজার ২৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা আগের অনুমোদিত ব্যয়ের ৫৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
শুধু ব্যয় নয়, প্রকল্পের পরিধিও বড় পরিসরে কমানো হয়েছে। শুরুতে দেশের ১৮টি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ জেলা এবং ২০টি বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ জেলার ৪৫০টি স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন জটিলতায় সেই সংখ্যা কমিয়ে ২৩৭টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি দেশের আটটি বিভাগের ৩৮টি জেলার ১০৬টি উপজেলায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পটির মেয়াদও বারবার বাড়ানো হচ্ছে। ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফা সময় বৃদ্ধির পর এবার আরও দুই বছর বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি জীবনরক্ষাকারী প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগছে প্রায় এক দশক।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে ৪৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের সংস্থান ছিল। এর মধ্যে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ১২২টি আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশন ২০২৫ সালের ১৪ মে মন্ত্রণালয়ের কাছে হালনাগাদ তথ্য চায়। জবাবে ১৬ জুন পাঠানো প্রতিবেদনে জানানো হয়, কাজ শেষ, হস্তান্তর ও চলমান প্রকল্পের সংখ্যা ২৫৩টি, জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় রয়েছে ২৬টি এবং ১৭১টি প্রকল্প তখনও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ছিল।
পরবর্তীতে ওই তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা কমিশন দেখতে পায়, সমাপ্ত, হস্তান্তর ও চলমান হিসেবে উল্লেখ করা ২৫৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১৪২টির কাজ চলছিল এবং মাত্র ৯৯টির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি প্রকল্পে কার্যাদেশ বাতিল, কাজ বন্ধ এবং জমি-সংক্রান্ত জটিলতা ছিল। এসব বিবেচনায় প্রথমে টেন্ডার জটিলতায় আটকে থাকা ১৭১টি এবং জমি জটিলতায় থাকা ২৬টি প্রকল্প বাতিল করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় আরও ৬টি কার্যাদেশ বাতিল এবং ১০টি শূন্য অগ্রগতির প্রকল্প বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রকল্প থেকে ২১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৫৮০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এতে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৫২ শতাংশ। যদিও বাস্তব অগ্রগতি ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দুর্যোগের সময় মানুষ ও গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর স্বাভাবিক সময়ে এগুলো শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, ইউনিয়ন পর্যায়ের সভা, হাট-বাজার এবং দুর্যোগ-পূর্ব ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলেছে, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এবং অসংখ্য গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে। ওই দুর্যোগের পর উপকূলীয় এলাকায় মানুষের জানমাল রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাটির কেল্লা নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৭২টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ অনেক এলাকায় এখনো নিরাপদ আশ্রয়ের ঘাটতি রয়েছে। সেই প্রয়োজন থেকেই বর্তমান প্রকল্পটি নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ একনেকে পাঠানো সুপারিশে বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দুর্যোগের সময় দ্রুত মানুষ ও গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।


