গত ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো মামলার শুনানি করছেন না, এজলাসে বসছেন না, কোনো রায়ও দিচ্ছেন না সাংবিধানিক পদ হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ। অথচ নিয়মিত পাচ্ছেন বেতন-ভাতাসহ রাষ্ট্রের দেওয়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন তাকে মামলার দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত রাখে। তখন থেকে হাইকোর্টের এই বিচারপতি বিচারিক কাজ থেকে পুরোপুরি দূরে আছেন। তা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত তার রাষ্ট্রীয় বেতন, ভাতা, সরকারি প্রটোকল এবং অন্যান্য সব সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।
অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও, বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ তার বিরুদ্ধে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি।
এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এক নজিরবিহীন ও অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতিটি এমন দাঁড়িয়েছে যে—একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি পদে বহাল থেকে সব রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিচ্ছেন, কিন্তু কোনো কাজ করছেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, কিন্তু তদন্ত হচ্ছে না। তাকে আদালতের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি পদেই বহাল আছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অনিশ্চয়তার এক খারাপ উদাহরণ। তারা মনে করেন, যেকোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করা উচিত অথবা পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়া উচিত। একজন বিচারককে এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসিয়ে রাখা আদালতের স্বচ্ছতা নষ্ট করে, জনগণের টাকার অপচয় ঘটায় এবং পুরো আইনি ব্যবস্থা ও অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয়কেই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত শুরু করেনি। তার ব্যাপারে কাউন্সিলের নতুন কোনো সিদ্ধান্তের কথাও আমি জানি না। হয়তো কাউন্সিল খুব শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত জানাবে।’
২০২৪ সালের অক্টোবরে ছাত্র ও আইনজীবীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে হাইকোর্টের যে ১২ জন বিচারককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বিচারপতি আরিফ ছিলেন তাদের একজন। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল—দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনৈতিক দলবাজ এবং বিগত সরকারের দোসর বিচারকদের অপসারণ করতে হবে। এছাড়া, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় একটি বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘টোকাই’ বলে উপহাস করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও ছিল বিচারপতি আরিফের বিরুদ্ধে।
সেই উত্তাল সময়ের পর, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া অন্য বিচারকদের মধ্যে কয়েকজন পদত্যাগ করেন, কাউকে কাউকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সুপ্রিম কোর্ট থেকে সরে যাওয়া বা অপসারিত বিচারপতিদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান, বিচারপতি মামনুন রহমান, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান, বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন, বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম, বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান, বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, বিচারপতি খিজির হায়াত এবং বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান।
অন্যদিকে, বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় গত এপ্রিলে তাকে আবার কাজে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিচারপতি আরিফের বিষয়টি এখনও ঝুলেই রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, এই ঘটনা একটি খারাপ নজির তৈরি করছে। কোনো কাজ না করিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে একজন বিচারককে বেতন দেওয়া বিচার বিভাগের ইতিহাসে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ মামুন মাহবুব।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগে তোলপাড়
২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের বিচার বিভাগে যে নজিরবিহীন তোলপাড় শুরু হয়েছিল, তার সূত্র ধরেই বিচারপতি শেখ হাসান আরিফকে নিয়ে এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
তৎকালীন সরকারের পতনের পর সুপ্রিম কোর্টের অনেক বিচারকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন রাজনৈতিক আনুগত্য, দুর্নীতি ও বিগত সরকারের সাথে যোগসাজশের অভিযোগে অভিযুক্ত বিচারকদের পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আন্দোলন শুরু করে।
এই তীব্র ক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারপতি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ১৬ অক্টোবর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন ছাত্র আন্দোলনকারী ও আইনজীবীরা হাইকোর্ট এলাকা ঘেরাও করেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বিচারপতি আরিফসহ ১২ জন হাইকোর্ট বিচারককে আদালতের কাজ থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখার ঘোষণা দেয়।
দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া তার অন্য সহকর্মীদের মধ্যে বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান, বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকার ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন বা অপসারিত হয়েছেন। কিন্তু বিচারপতি আরিফের বিষয়টি এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। তিনি কোনো বিচারিক কাজ না করেই পূর্ণ সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে বহাল আছেন। এমনকি, এত বড় অভিযোগের পরেও তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত হচ্ছে না।
এই অচলাবস্থার কারণে এখন সবার নজর ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’-এর দিকে। এই সাংবিধানিক সংস্থাই উচ্চ আদালতের বিচারকদের অক্ষমতা বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিচারক অপসারণের নিয়মটি বারবার বদলেছে—কখনও এই ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল, আবার কখনও রাষ্ট্রপতির হাতে গেছে।
১৯৭৭ সালে চালু হওয়া এই ‘কাউন্সিল’ ব্যবস্থাটি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে সংসদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ চূড়ান্তভাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থাটিই পুনর্বহাল করে।
প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারককে নিয়ে এই কাউন্সিল গঠিত হয়। এই কাউন্সিলের বিচারকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা এবং তাদের অপসারণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার ক্ষমতা রয়েছে।
তবে বিচারপতি আরিফের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি প্রথম ধাপেই আটকে আছে। তাকে আদালতের কাজ থেকে সরিয়ে রাখার পর ১৮ মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও কোনো তদন্ত শুরু হয়নি, কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি এবং এই সংকটের সমাধানের কোনো তারিখও ঠিক হয়নি। আপাতত, তিনি কাগজে-কলমে বিচারপতি হলেও বাস্তবে কোনো কাজ করছেন না।


