হাতিরপুলের একটি সুপারশপ থেকে কয়েকটি প্যাকেটজাত খাবার কিনেছিলেন ইউসরা খন্দকার। বাইরে থেকে প্যাকেটের দাম আগের মতো মনে হলেও ভেতরের পরিমাণ কমেছে। একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন তাকে একাধিক প্যাকেট নিতে হচ্ছে।
ইউসরা বলেন, ‘কয়েক বছর আগে যে পরিমাণ চিপস একটি প্যাকেটে পাওয়া যেত, এখন সেই পরিমাণ পেতে দুই থেকে তিনটি প্যাকেট কিনতে হয়। অনেক কোম্পানি দাম বাড়ায়নি, কিন্তু প্যাকেটের আকার বা ভেতরের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। ছোট প্যাকেটে মন ভরে না, তাই বেশি কিনতে হচ্ছে।’
পণ্যের দাম না বাড়িয়ে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার এই কৌশলকে অর্থনীতির ভাষায় ‘শ্রিংকফ্লেশন’ বলা হয়। উৎপাদন উপকরণ, জ্বালানি, কাঁচামাল ও ডলারের দাম বাড়ায় ব্যয় বেড়েছে। সেই চাপ সামলাতে বাজার ধরে রাখার কৌশল হিসেবে অনেক কোম্পানি পণ্যের পরিমাণ কমাচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের রিকশাচালক হরিশ দাসও এর প্রভাব টের পাচ্ছেন। চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য কেনা ড্রাই কেকের প্যাকেট ছোট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো পরিমাণ পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘আগে একটা প্যাকেটেই হতো। এখন দুইটা কিনতে হয়। কোম্পানিগুলো সাইজ কমাইয়া দিছে। লস তো আমাগোই।’
বাজারে এর আরেকটি প্রভাব দেখা যাচ্ছে ভোক্তার মোট খরচে। ১০ টাকার একটি প্যাকেটের বদলে একই পরিমাণ পণ্য পেতে দুটি প্যাকেট কিনলে খরচ হয় ২০ টাকা। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সময় এটি ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
শুধু প্যাকেটজাত পণ্য নয়, রাস্তার পাশের সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি ও জিলাপির আকারও ছোট হয়েছে। ফলে এসব খাবারেও কেউ কেউ আগের একটি পণ্যের বদলে দুটি কিনছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. তানভীর আলম হিমেল বলেন, ‘এর পেছনে কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর কৌশল থাকতে পারে। আবার উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও থাকতে পারে। তবে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়া এটিকে সরাসরি ‘অন্যায্য ব্যবসায়িক আচরণ’ বলা ঠিক হবে না।’
তার মতে, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও লজিস্টিকস ব্যয়, বাজারের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি ব্যবসায়িক বাস্তবতার অংশ।
ছোট প্যাকেটের বিক্রি বাড়ছে
বাজারের চাহিদায়ও ছোট প্যাকেটের প্রবণতা স্পষ্ট। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্যমতে, গত দুই বছরে বিস্কুটের ছোট প্যাকেটের বিক্রি পাঁচ গুণ বেড়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করার পর থেকে ভোক্তারা বড় প্যাকের পরিবর্তে বেশি করে ছোট প্যাক কিনছেন। ৫, ১০ ও ২০ টাকা মূল্যের পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কাঁচামাল ও ডলারের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে টিকে থাকতে কোম্পানিগুলো পণ্যের ওজন কমিয়ে দিচ্ছে। দাম বাড়ালে তা ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।’
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ব্যবসাতেও ছোট পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ২০২৪ সাল থেকে ১০ থেকে ২০ টাকা মূল্যের পণ্যের বিক্রি বেড়ে এখন প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ।
বেকারি পণ্যে দাম ও ওজন দুটিই সমন্বয়
উৎপাদন ব্যয় সামলাতে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি ওজন কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার থেকে সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি।
সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, ‘তেলের দাম ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ৩৬ হাজার টাকা হয়েছে। ময়দার দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই। দাম সমন্বয় করা ছাড়া উপায় নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘৫০ টাকার রুটি ৫০ টাকাই থাকবে। তবে যেটা ৪০০ গ্রাম ছিল, সেটা হয়তো ৩৫০ বা ৩২০ গ্রাম হবে।’
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা আটার দাম ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। খোলা ময়দার দামও কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে।
সয়াবিন তেলের সরবরাহও স্বাভাবিক নয়
সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দিলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি সুমন ইসলাম বলেন, ‘কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছে না। দোকানে তেল নেই, ক্রেতারা ফিরে যাচ্ছেন।’
কারওয়ান বাজারের রিফাত মেসার্স স্টোরের মালিক রিফাত হোসেনও একই কথা বলেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করার অনুমোদন দেয়।
কাঁচাবাজারেও বাড়তি চাপ
বৃষ্টির কারণে সবজির দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা মো. উসমান।
গোল বেগুন ১৪০ টাকা ও লম্বা বেগুন মানভেদে ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা কেজি। অন্য বাজারে এর দাম ৪০ টাকা।
বর্ষার সবজির মৌসুম শেষের দিকে। শীতের সবজিও এখনও পর্যাপ্ত আসেনি। ফলে বেশিরভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগাম শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।
দক্ষিণ বনশ্রীর বিক্রেতা ইমন ইসলাম জানান, ভোরে কারওয়ান বাজারে পাইকারি কিনতে গিয়ে বেগুন, বরবটি ও কাঁচামরিচের দাম বাড়তি পেয়েছেন।
ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. গফুর জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক খামার মুরগি তোলেনি। এতে দাম বেড়েছে।
মেরুল বাড্ডার বিক্রেতা আনিস আহমেদ জানান, সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা কমেছে।
কারওয়ান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে চন্দন ইসলাম বলেন, ‘ডিম, ব্রয়লার মুরগি, তেল, আটা-ময়দা, চাল, ডালসহ সবকিছুর খরচ বেড়েছে। আমাদের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে।’


