যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাপট দেখাতে চায় তবে ইরান তাদের কাছে কিছুতেই নত হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে এসে শুক্রবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভারতের ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে তেহরান-নয়াদিল্লির মধ্যে সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, অনুবাদকের মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘প্রথমেই আমি ভারত সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে তাদের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমাদের মধ্যে অত্যন্ত ভালো আলোচনা হয়েছে। আমি আশা করি, এসব আলোচনা ও সম্পর্ক সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার পথ তৈরি করবে। আমরা একসঙ্গে এসব সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে পারি।’
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে শুক্রবার সকালে ভারতে আসা পেজেশকিয়ান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশ দুটি ইরানকে সব দিক থেকে চাপ দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আজ ইরান একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সফলভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। তারা আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, কিন্তু আমরা তা মেনে নিতে চাই না। আমরা কখনো তাদের সামনে নত হব না। তারা চাপ দিলে আমরাও প্রতিরোধ করব।’
‘তারা দাবি করে, তারা মানবাধিকারের সমর্থক। কিন্তু বাস্তবে তারাই প্রকৃত সন্ত্রাসী, কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা এক মুহূর্তে ১৬৮ জন স্কুলশিশুকে হত্যা করেছে’, যোগ করেন তিনি।
‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) আমাদের সন্ত্রাসী বলে? তাহলে যারা মানুষ হত্যা করে, বিজ্ঞানীদের ওপর হামলা চালায়, স্কুল ও হাসপাতালে আক্রমণ করে, তাদের কী বলা হবে?’, প্রশ্ন রাখেন পেজেশকিয়ান।
তিনি বিরোধী দুই দেশকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘যদি তোমাদের সাহস থাকে, তাহলে শুধু আমাদের সেনা ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে লড়াই কর। কেন অবকাঠামো ও মানুষের জীবন-জীবিকা লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?’
‘ইরানের জনগণ অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না’ উল্লেখ করে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে বসবাসকারী সব মানুষ, সমগ্র মানবজাতি, সমান অধিকার ভোগ করে।’

এর আগে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে দুই নেতার এটি ছিল দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে ৩১ আগস্ট বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে তাদের বৈঠক হয়েছিল।
বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। ব্রিকস-সংক্রান্ত বৈঠকে ইরানের নিয়মিত ও উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণের জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি, বিশেষ করে বর্তমান কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ করায় তাকে ধন্যবাদ জানান ভারতের সরকার প্রধান।
মোদি বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের চেতনা গড়ে তুলতে ব্রিকসের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ব্রিকস ব্যবসায়িক ফোরামের নেতাদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দুই নেতা পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, সব সমস্যা আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সেইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী নাবিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া বহুপক্ষীয় বিভিন্ন সংগঠনে, বিশেষ করে ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ভারত ও ইরানের অব্যাহত সহযোগিতার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।


