ইয়েমেনে সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৬ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুতির সংকট প্রতি ঘণ্টায় আরও গুরুতর হচ্ছে। গত জুলাইয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে ফের গৃহযুদ্ধের শঙ্কায় মানুষজন নিরপদ আশ্রয়ের খোঁজে নেমেছে।
আইওএম-এর বরাতে আল জাজিরার খবরে বলা হয়, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহের তুলনায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, পুরো পরিবারসহ প্রায় রাতেই ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ এবং তাদের যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ স্থান নেই।
এর এক দিন আগে সংস্থাটি জানিয়েছিল, চলতি মাসের শুরু থেকে ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত মঙ্গলবার এই সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৫০০ জন।
জাতিসংঘের অধিনস্ত সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও তাইজ এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাইজ এলাকা। ওই প্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইওএম।
এদিকে সরকারি বাহিনী ও ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেন থেকে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ জিবুতিতে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন জিবুতির অর্থ ও অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালেহ।
আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলে অবস্থিত ছোট দেশ জিবুতি ইয়েমেনের বিপরীত পাশে অবস্থিত। দেশটি এডেন উপসাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইলিয়াস মুসা দাওয়ালেহ বলেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে অন্তত এক হাজার ৪০০ শরণার্থী জিবুতিতে পৌঁছেছে।
1400 #refugees arrived in #Djibouti from #Yemen in just 24 hours.
#BabelMandeb #Redsea https://t.co/l3CMF72l7T— Ilyas M. Dawaleh (@Ilyasdawaleh) September 12, 2026
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা জানিয়েছেন, পশ্চিম উপকূল থেকে পিছু হটা সরকারি বাহিনী পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং তারা আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সাবা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-আরাদা পশ্চিম উপকূলে হুথিদের আধিপত্যকে ‘বেদনাদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক’ বলে বর্ণনা করেন। তার মতে, যুদ্ধের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের অংশ হিসেবে এ ধরনের পরাজয় বা পিছিয়ে যাওয়া ঘটতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, হুথিরা শান্তি প্রক্রিয়াকে অচল করে দিয়েছে এবং ইয়েমেনে আবারও যুদ্ধের পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।
আল-আরাদা বলেন, সরকারি বাহিনী একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং মারিবসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে রাজধানী সানা পুনরুদ্ধার করা।
পশ্চিম উপকূল থেকে সরে আসা সরাকারি সেনাদের মারিবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আল-আরাদা বলেন, ‘যেসব বাহিনী পিছু হটেছে, তারা এখন নিজেদের পুনর্বিন্যাস করছে এবং কোনো না কোনোভাবে আবার যুদ্ধে ফিরবে।’
এদিকে লোহিত সাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলার এক দিন পর শনিবার বন্দরে তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। একই সময়ে হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে বাব আল-মান্দেব প্রণালির মায়ুন দ্বীপ দখলে নেয়।
সৌদি সরকার এবং হুথি বিদ্রোহীদের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে পারস্য উপসাগরের পাশপাশি লোহিত সাগরেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ইরান যুদ্ধ ঘিরে নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
লোহিত সাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুথিদের এই অগ্রগতি কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সাফল্য। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের কৌশলকে শক্তিশালী করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীরা বেঁকে বসলে তাদের মাধ্যমে ইরান বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর কৌশলে আরও সুবিধা পেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।


