লোহিত সাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলার এক দিন পর বন্দরে তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে বাব আল-মান্দেব প্রণালির একটি কৌশলগত দ্বীপ দখল করেছে।
দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। সৌদি সরকার এবং হুথি বিদ্রোহীদের এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে পারস্য উপসাগরের পাশপাশি লোহিত সাগরেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ইরান যুদ্ধ ঘিরে নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
লোহিত সাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুথিদের এই অগ্রগতি কয়েক বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সাফল্য। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের কৌশলকে শক্তিশালী করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীরা বেঁকে বসলে তাদের মাধ্যমে ইরান বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর কৌশলে আরও সুবিধা পেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, শুক্রবার হামলার পর তারা পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে। এটি একটি ‘সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ বলে জানিয়েছে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
ইরাক থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোনের মাধ্যমে এই হামলা চালানো হয়েছে দাবি করে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরাক সরকার যেন ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ’ পায় তা নিশ্চিত করতে তারা কোনো পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আলি আল-জায়েদি মাইসান প্রদেশের সামরিক কমান্ডের কার্যক্রম নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ওই কমান্ডের প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সরকারের মুখপাত্র সাবাহ আল-নুমান শনিবার সকালে এক বিবৃতিতে জানান, কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে যে সৌদি আরবে লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলো মাইসান প্রদেশের একটি স্থান থেকে পরিচালিত হয়েছিল।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র গত জুলাই মাসে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালায়। সে সময় তারা অভিযোগ করেছিল, এসব গোষ্ঠী সৌদির তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। সেসব হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুথি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীর আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ওই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারা সহায়তা করেছিলেন।
পাইপলাইনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর ব্যবহার করে আসছে। দেশটির পূর্ব-পশ্চিম জুড়ে বিস্তৃত তেল পাইপলাইনটি ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত হয়। ইরান যুদ্ধের জেরে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির সক্ষমতা ধরে রাখতে এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু নাগাদ সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর থেকে তেল রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি করেছে। এই বন্দরটি ওই পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত।
এদিকে হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত ছোট ও জনবসতিহীন আগ্নেয় দ্বীপ মায়ুন দখল করেছে। দ্বীপটি পেরিম নামেও পরিচিত।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন হুথি কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লোহিত সাগরে ২৮ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুথিদের জাহাজ চলাচল বন্ধের প্রচেষ্টা ওই পথকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে শুক্রবার এক বিবৃতিতে হুথি সশস্ত্র বাহিনী উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের অগ্রগতির কথা জানালেও মায়ুন দ্বীপ, মোকা বন্দর বা বাব আল-মানদেব প্রণালির কথা উল্লেখ করেনি। তারা বিবৃতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে ‘পাল্টার জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘এই পথে সৌদি জাহাজ ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সামুদ্রিক চলাচল নিরাপদ।’
বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির দাবি, ইয়েমেনের তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধের জবাব হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে হুথি পরিচালিত একটি সম্প্রচারমাধ্যম বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, মোখা বন্দর দখল করার পর সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
মায়ুন দ্বীপ দখলে সৌদি বাধা না দেওয়ায় বিস্মিত ইয়েমেন সরকার
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোখা দখলের সময় সৌদি বিমান বাহিনী কোনো বড় ধরনের প্রতিরোধ না করায় তারা বিস্মিত হয়েছেন। মোখা বাব আল-মানদেব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। তার ধারণা, বড় ধরনের বিমান অভিযান চালানোর জন্য সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পায়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব হুথিদের ‘অমূল্য সুযোগ’ দিয়েছে।
আরও পড়ুন: বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে হুতিরা
২০২৩ সালের শেষ দিকে হুথিরা গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে কিছু জাহাজে হামলা শুরু করার পর বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়।
লোহিত সাগরের বিকল্প পথ হিসেবে সৌদি আরব নতুন ব্যবস্থা নেওয়ায় চলতি বছর জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছিল। তবে হুথিদের নতুন হুমকির কারণে সেই কার্যক্রম আবার সীমিত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স।
এর ফলে সৌদি আরবকে আরও একটি বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। দেশটি এখন লোহিত সাগর থেকে উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগরের দিকে তেল পাঠাচ্ছে। এর জন্য সুয়েজ খাল অথবা মিসরের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য অনেক দীর্ঘ পথ।
হুথিরা এই পথেও হামলার হুমকি দিয়েছে। নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে তারা আগস্টের শেষ দিকে লোহিত সাগরের উত্তর অংশে একটি সৌদি জাহাজে হামলা চালায়।
সৌদি-হুথি সংঘাতে ইরানের অবস্থান
এদিকে শুক্রবার ইরান সরকার সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে আবারও আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি অবরোধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এটি ছিল তাদের মিত্রদের প্রতি সমর্থনের প্রকাশ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, বৃহস্পতিবার ইরান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ‘স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার’ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসের মুখপাত্র বুধবার ফের স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় ইয়েমেন ইস্যুও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
জবাবে সৌদি আরব বলেছে, তারা হুথি ও ইয়েমেন সরকারকে সব সময় আলোচনার সুযোগ দিয়েছে এবং একই সঙ্গে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।
বাব আল-মান্দেবের দিকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুথিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ বলেছে, তারা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় সামনের সারিতে রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের নতুন হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
২০১৪ সাল থেকে হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ওই বছর তারা উত্তর ও মধ্য ইয়েমেনের বড় অংশ এবং রাজধানী সানা দখল করে। পরের বছর ২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় সৌদি আরব।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান সংঘাত ২০২২ সাল থেকে অনেকাংশে বন্ধ থাকা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ করে দিতে পারে।

আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে এই সংঘাতে প্রায় চার কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধে নিহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি মানুষ এবং বহু মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মিশন প্রধান আবদুস সাত্তার এসোয়েভ বলেন, মানুষ যা নিতে পেরেছে তাই নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে এবং তা আরও দ্রুত বাড়তে পারে। পালিয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও রয়েছেন
এসোয়েভ বলেন, ‘তাদের চোখে ভয় দেখা যায়, মানুষ আতঙ্কিত।’


