নয়াদিল্লিতে রোববার শেষ হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, ডিজিটাল অবকাঠামো, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ এই মূল প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি অংশীদার দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
২০২৬ সালের সম্মেলনের আগে ব্রিকসের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সম্প্রসারিত জোটটির কার্যকারিতা ধরে রাখা। ২০২৪ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া সদস্য হওয়ার পর ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ধরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
উদ্বোধনী অধিবেশন ‘ইনক্লুসিভ গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং মাল্টিল্যাটারালিজম’-এ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দেন।
এর ফলে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্রিকসের সদস্যরা ‘১৮তম নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬’ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেন।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মধ্যে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে একই প্ল্যাটফর্মে রাখা ভারতের জন্য ছিল অন্যতম বড় পরীক্ষা। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা, পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক তৎপরতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা ব্রিকসের ঐক্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সম্মেলনের প্রথম দিন মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের উষ্ণ সাক্ষাৎ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার প্রতিফলন ঘটায়। নয়াদিল্লি ঘোষণায় ইরান, আমিরাত ও সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক নিরাপত্তা বজায় রাখা, সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানোর আহ্বানে একমত হয়।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে সুরক্ষাবাদী প্রবণতার বিরোধিতা করে ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে ঋণের স্থায়িত্ব, জলবায়ু অর্থায়ন, খাদ্যনিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
সম্মেলনের বাইরে তিন দিনে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে মোদির ১৫টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদি।
শনিবার সন্ধ্যায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিন পিংয়ের সঙ্গে মোদির বৈঠক ছিল সবচেয়ে আলোচিত। সাত বছর পর ভারতে সি জিন পিংয়ের সফরের মধ্যে দুই নেতা সীমান্তে নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর সামরিক বিচ্ছিন্নতার পর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে বজায় রাখার বিষয়ে তারা একমত হন। সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধাপে ধাপে চালু, কারিগরি কর্মীদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আলোচনা পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়েও অগ্রগতি হয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ভারত সফর করেন। বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ, কম দামে অপরিশোধিত তেল ও সার পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে চাবাহার বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (আইএনএসটিসি) এগিয়ে নেওয়া নিয়েও আলোচনা হয়।
ইন্দোনেশিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপাইন, বুরুন্ডি, উগান্ডা, কাজাখস্তান, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য বহুমুখীকরণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি ও কৃষিনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
১২ সেপ্টেম্বর ভারত মণ্ডপমের ‘ভারত ইনোভেটস এক্সিবিশন’-এ নেতাদের ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানো হয়। সম্মেলনে ‘ব্রিকস ডিপিআই রিপোজিটরি’ চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোকে লাইসেন্স ফি ছাড়াই ভারতের ওপেন সোর্স ও মডুলার ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো ভারতের ডিজিটাল মডেল গ্রহণের সুযোগ পাবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অস্থিরতা ও মুদ্রার ওঠানামার মধ্যেও ব্রিকস দেশগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য আর্থিক কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মোট ঋণপোর্টফোলিওর ৪০ শতাংশ স্থানীয় মুদ্রায় দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্রিকসের উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণসুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকেও সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছে। নয়াদিল্লি ঘোষণায় সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের দাবিতেও ব্রিকস নেতারা ঐকমত্যে পৌঁছান। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়। এ ছাড়া বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্ণাঙ্গ দুই স্তরের বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনকে ঘিরে নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভারত মণ্ডপমে বৈশ্বিক নেতাদের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেড় হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি অংশ নেন।


