ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুনের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুনের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুনের ঘটনায় হাসপাতালের অধ‍্যাপক গোলাম রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। তিন কর্ম দিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- হাসপাতালের সহকারী পরিচালক, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেলের নতুন ভবনের আটতলায় লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি স্টেশনের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ সময় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত নিচে নামার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়।

ঘটনার পরপর প্রাথমিকভাবে পদদলিত হয়ে ছয়জন ও পরে চারজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরে। তবে রাতে প্রশাসন জানায়, তাদের কেউ আগুনে কিংবা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন এমন তথ্য নিশ্চিত নয়। সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামার সময় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, ‘লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে যুক্ত বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার কারণে ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের পরিমাণ বড় না হলেও ধোঁয়ার কারণে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।’

আগুনের ঘটনায় কোনো ওয়ার্ডের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানান হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম।

আগুন পুরোপুরি নেভার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি জানান, হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিহতের তালিকায় থাকা দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবার নিশ্চিত করেছে। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। যাদের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে একজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকিদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ চিকিৎসকেরা এখনো স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি। এ বিষয়ে তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে। হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে রোগী মারা যেতে পারেন। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যটি অসত্য’, যোগ করেন তিনি।

এর আগে পৌনে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে তালিকা আমাকে দেখানো হয়েছে, সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নেই। আমার কাছে আরও একটি তালিকা আছে, সেটিও যাচাই করে দেখব। মর্গের তথ্যও নেওয়া হয়েছে। তবে মর্গের তথ্যের সঙ্গে পাওয়া অন্য তথ্যের মিল নেই। সব তথ্য মিলিয়ে দেখার পরই প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

আরও পড়ুন

তবে আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, তাদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া বা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

আগুনের ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু নিশ্চিত করে বলা হয়নি।

একটি সরকারি সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগের নতুন ভবনটিতে জরুরি প্রয়োজনে, দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার জন্য, বাইরে থেকে উদ্ধারকাজের জন্য বা বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সেখানে আরও চারটি সিঁড়ি থাকার পরও সেগুলোকে সবসময় তালা দিয়ে রাখা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার এ ব্যাপারে জানানোর পরও তারা এগুলো খুলে রাখার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সিঁড়িগুলো বন্ধ রাখার কারণেই আগুন লাগার সময় লোকজন একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে বের হওয়াতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

এ অভিযোগের বিষয়ে কমিশনার বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জেনেছি। নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালের কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালের কোনো অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসানও আগুনে হতাহতের বিষয়ে ধোঁয়াশার কথা জানান। রাত ১১টার দিকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন তালিকা যাচাই করছি এবং যাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তবে এখনো আমাদের হাতে কোনো কনক্রিট এভিডেন্স (সুনির্দিষ্ট প্রমাণ) আসেনি।’

ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য কীভাবে ছড়িয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা যেভাবে শুনেছেন, আমরাও সেভাবেই শুনেছি। এখন সেই তথ্যই যাচাই করার জন্য সবাই সরেজমিনে এসে তদন্ত করছি।’

আগুনের ঘটনায় রাতেই হাসপাতাল পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি জানান, মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সন্ধ্যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় এক শিশু থাকার কথাও জানান তিনি। নিহতদের মধ্যে প্রথমে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়ার কথা জানানো হয়। তারা হলেন-নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার রমজান (৩৮) ও জাহানারা (৫০), এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫)।

তবে এই তালিকার জাহানারাকেই (৫০) পরে জীবিত ও চিকিৎসাধীন বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে শাহজাহান ও কুলসুমার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজন।

তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা আক্তারের ননদ নাজমা বেগম জানান, ১২ দিন ধরে তার জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন কুলসুমা। তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও সঙ্গে ছিলেন। আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুমা তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন লোকজন তার ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন, কিন্তু মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে কুলসুমাকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তিনি জীবিত ছিলেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কুলসুমার মৃত্যু হয়।

নাজমা বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ আছে।’ হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতাল থেকে তারা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান তিনি।

পদদলিত হয়ে মারা গেছেন দাবি করা অপর ব্যক্তি ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির। তার ছেলে পলাশ জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তার বাবা। আগুন লাগার সময় মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তারের সঙ্গে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তারা পড়ে যান। পরে তার মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুজনই বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার সময় হাসপাতালে ছিলেন না জানিয়ে পলাশ বলেন, ‘বাবার মরদেহ রাতেই বাড়িতে নেওয়া হয়েছে। আমি ভিডিও কলে মরদেহ দেখেছি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর