ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক ভিডিও বক্তৃতায় ‘আসসালামু আলাইকুমে’র মতো শব্দ ব্যবহার করায় বদলি হয়েছেন মুসলিম আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানু। এনিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ড. বুশরা বানুকে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের (এসএপি) ৪র্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে বদলি করা হয়েছে।
এর আগে সৌদি আরবে অধ্যাপনা করা বুশরা বানু দেশে ফিরে ইউপিএসসি পরীক্ষায় দুইবার উত্তীর্ণ হন এবং শেষপর্যন্ত আইপিএস কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
সম্প্রতি আইপিএস পরীক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে বুশরা বানু এক ভিডিও বক্তৃতায় ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জাজাকাল্লাহ’র মতো ইসলামি শব্দ ব্যবহার করেন। এরপর পরই হিন্দুত্ববাদীদের তীব্র আক্রমণের শিকার হন তিনি।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও হ্যান্ডেল থেকে তার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বুশরা কেন ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’ ব্যবহার করলেন না—এ কারণে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এমনকি কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘সুদর্শন নিউজ’ বিষয়টিকে ‘ইউপিএসসি জিহাদ’ তকমা দিয়ে বিতর্ক উসকে দেয়। এরপর ‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ নামের একটি সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে বুশরা বানুর বিরুদ্ধে সরকারি পদে থেকে ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারের লিখিত অভিযোগ দায়ের করে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। ওই অভিযোগ জমা পড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরকার তার বদলির নির্দেশ জারি করে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র আন্তর্জাতিক মঞ্চের সাথে তুলনা টেনে বলেন, ‘একদিকে বিজেপি সরকার ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রার্থনা কক্ষ বানিয়ে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার বহর দেখাচ্ছে, অন্যদিকে মিডিয়া ও চরমপন্থীদের ঘৃণার কাছে নতিস্বীকার করে শুধু ‘আসসালামু আলাইকুম’ ও ‘জাজাকাল্লাহ’ বলার কারণে বুশরা বানুর মতো একজন যোগ্য নারী আইপিএসকে কোণঠাসা করা হচ্ছে।’
মহুয়া মৈত্র জানান, ‘বুশরা, আমরা তোমার পাশে আছি।’
তাছাড়া সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে রাজ্য আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠান থেকে মুসলিম অফিসারদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে আইপিএস ও আইএএস অ্যাসোসিয়েশনকে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন মহুয়া মৈত্র। সেই ঘটনার ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় নতুন এই বিতর্ক তৈরি হলো।
কংগ্রেস সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ি এই ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনলাইন ট্রোলিং হিসেবে চিহ্নিত করে আইপিএস অ্যাসোসিয়েশনকে বিষয়টি আমলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদের পাশাপাশি সাংবাদিক কাভিশ আজিজও বৈষম্যের প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘বুশরা বানুকে কেবল সালাম জানানোর অপরাধে বদলি করা হলো। অথচ ইউনিফর্ম পরে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া অনুজ চৌধুরীর মতো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। অফিসারটির পাশে দাঁড়ানোর বদলে প্রশাসন তাকে বদলি করে দিল।’
নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আপনারা ঠিক কেমন ভারত গড়ছেন?’ পরিশেষে তিনি যুক্ত করেন, ‘ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য কোনো দুর্বলতা নয়, এটি আমাদের গর্ব। বুশরা, আপনার সেবার জন্য ধন্যবাদ! জাজাকাল্লাহু খাইরান!’


