ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের সরবরাহ কমে গেছে, বেড়েছে দাম। অনেক রেস্তোরাঁ মেনু থেকে বাদ পড়েছে গরুর মাংসের পদ। ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার একমাত্র গবাদিপশু জবাইখানার সামনে পড়া ট্যাংরা এলাকার গলিটি একেবারে ফাঁকা। ঔপনিবেশিক আমলের ওই ভবনটি দেখতে দুর্গের মতো। বিশাল লোহার গেটগুলো ভেতর থেকে তালাবদ্ধ।
গেটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলে দেখা যায়, বিশাল ফাঁকা চত্বরে স্কুলের ছেলেরা দৌড়াদৌড়ি করছে ও খেলছে।
স্থানীয় একটি খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম বলেন, ‘মে মাসে জবাইখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ওই ছেলেরা দেয়াল টপকে জবাইখানায় ঢুকে পড়ে।’
তিনি জানান, দোকানটি মূলত দিনমজুর, ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের সেবা দেয়। তিনি এখনো এই নির্জনতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না এই সরকার খুব শিগগিরই এটা আবার চালু করতে দেবে।’
বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিজয়ী হওয়ার পর গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যে গবাদিপশু জবাই নিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর ও নির্দিষ্ট ধরনের মহিষ জবাই করা যাবে না।
জবাইয়ের জন্য প্রাণীটির বয়স ১৪ বছরের বেশি হওয়া, কাজ বা প্রজননের অনুপযোগী হওয়া অথবা বয়স, আঘাত, বিকৃতি কিংবা নিরাময়-অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হওয়ার মতো শর্ত রয়েছে। অনুমোদিত প্রাণীও কেবল নির্দিষ্ট পৌর বা অনুমোদিত কসাইখানায় জবাই করা যাবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সনদপ্রাপ্ত প্রাণী কেবল পৌর বা স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত জবাইখানায় জবাই করা যাবে এবং খোলা জায়গায় জবাই নিষিদ্ধ।
মে মাসে ঈদ ঘনিয়ে আসার সময়ে এই বিজ্ঞপ্তি আসায় কলকাতা ও পুরো রাজ্যে গরুর মাংসের সংকট দেখা দেয়। তিন মাস পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। পাশাপাশি যোগ হয়েছে লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা। জুন মাসে পৌর করপোরেশন বিলুপ্ত হওয়া এবং মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রয়েছে। পৌরসভার পরবর্তী নির্বাচন ডিসেম্বরে নির্ধারিত।
ট্যাংশের মাংস ব্যবসায়ী মুশতাক জানান, তার আগের ছয় প্রজন্ম কলকাতার বাসিন্দা হয়ে এই ব্যবসা করলেও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েননি। তিন মাসের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো আয় করতে পারছেন না।
খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম জানান, সরবরাহ না থাকায় তারা এখন শুধু ভুনা মাংস বিক্রি করছেন। চাপ বা স্টু বানানো বন্ধ করেছেন। গরুর মাংসের ভুনা প্রতি প্লেট ১০০ রুপি থেকে বেড়ে ১২০ রুপি হয়েছে এবং কেজিপ্রতি দর ২০০ থেকে ২৫০ রুপি থেকে বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে পৌঁছেছে।
বিক্রি ৫০ শতাংশ কমে গেছে জানিয়ে আলম বলেন, ক্রেতারা প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতেও ভয় পাচ্ছেন। তিনি জানান, তাদের বাড়িতেও গরুর মাংস খাওয়া সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয়বার থেকে কমে একবারে নেমে এসেছে। মাটন কেনার সামর্থ্য না থাকায় তারা এখন সবজি, সস্তা মাছ ও মুরগির ওপর নির্ভর করছেন।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রধান গরুর মাংস ভোগকারী রাজ্যগুলোর একটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার এবং ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গরু বা মহিষের মাংস ভোগ করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গরুকে পবিত্র মনে করলেও পাশের রাজ্য আসাম ও দক্ষিণের কেরালার মতো পশ্চিমবঙ্গও দেশের সর্বোচ্চ গরুর মাংস ভোগের হার থাকা রাজ্যগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি তথ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গের দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিম গরুর মাংস খান। পাশাপাশি খ্রিষ্টান, দলিত সম্প্রদায়ের অংশ এবং কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ও তাদের নিয়মিত খাদ্যের অংশ হিসেবে গরুর মাংস ভোগ করে। প্রাণী জবাইয়ের শর্ত নির্ধারণকারী আইনটি নতুন না হলেও রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এর প্রয়োগ কঠোর হয়েছে।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কলকাতার ট্যাংরা জবাইখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানকার এক কর্মকর্তা চত্বরের সীমানা দেয়ালের পাশের ছোট সবুজ দরজা খুলে বলেন, ‘পরে আসুন, আজ প্রধান কর্মকর্তা নেই।’
এই দিনগুলোতে অফিসে কী কাজ করেন–জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু আসি, কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে বাড়ি চলে যাই।’ ব্যবসা কখন স্বাভাবিক হবে বা আদৌ হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
কলকাতাভিত্তিক ব্যবসায়ী আলফাজ লাইক জানান, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মধ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় তার ডেইরি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে তিনি তার অবসরপ্রাপ্ত গরুগুলো কম দামে কসাই ও মাংস সরবরাহকারীদের কাছে বিক্রি করে দেন। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে গবাদিপশু ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যতালিকায় গরুর মাংস অতীতের বস্তু হয়ে ওঠা শুধু সময়ের ব্যাপার।
দেশে রাজস্থান, গুজরাট, হারিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে গবাদিপশু জবাই ও বিক্রিতে বিভিন্ন আইনি কঠোরতা রয়েছে। এর পাশাপাশি তথাকথিত গোরক্ষক দলগুলো গবাদিপশু ব্যবসা বা গরুর মাংস বহনের অভিযোগ এনে মুসলিম ও দলিতদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো হামলাকারী বা হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো শিকার হওয়াদের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
বর্ণনা করতে গিয়ে আলফাজ লাইক বলেন, ‘আমি সকালের নাস্তায় গরুর মাংস খেতাম, কিন্তু এখন গরুর মাংস আনা বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলায় এখন গরুর মাংস বহন মাদক বহনের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।’
ব্যবসা গুটিয়ে তিনি এখন ছাগল কেনাবেচা, চাষাবাদ এবং নিজের কৃষিজমি ইজারা দিয়ে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছেন।
মুসলিম প্রধান পার্ক সার্কাস এলাকায় গরুর মাংস বিক্রি করে এমন পাঁচটি দোকানের মালিক ও ম্যানেজাররা জানান, মে মাস থেকে তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার একটি সারির সব দোকান দুই মাস বন্ধ ছিল।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এক দোকানদার বলেন, ‘সরবরাহ অনিয়মিত হয়েছে, দাম বেড়েছে, তাই বিক্রিও ভালো হয়নি। আর সত্যি বলতে মাংসের মানও বদলে গেছে। এখন একেবারেই ভালো সময় নয়।’
গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিয়ম এবং সরবরাহের মান কমার কারণে কলকাতার অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে তাদের গরুর মাংসের পদ বিক্রি বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইকনিক জমজম রেস্তোরাঁ।
রেস্তোরাঁ চেইনের পরিচালক শাদমান ফাইজ বলেন, ‘শহরের তিনটি শাখার সবগুলোতেই মেনু থেকে গরুর মাংসের খাবার সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। আমরা গ্রাহক হারিয়েছি এবং প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষতি বহন করছি। এমনকি কর্মীদের ছাঁটাই করতে হয়েছে।’
এদিকে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পার্ক স্ট্রিটের বাণিজ্যিক এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘অলি-পাব’, যা কয়েক দশক ধরে বিফ স্টেকের জন্য বিখ্যাত, সেখানেও এখন আর নিয়মিত এই গরুর মাংস পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানের এক ব্যবস্থাপনা সদস্য বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মাংসের সরবরাহ পাই না, তাই মাংস থাকলে তবে এটি আমাদের এখানে পাওয়া যায়।’ কলকাতায় আগে কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানান তিনি।
কলকাতা পৌর করপোরেশনের কমিশনার ও প্রশাসনিক প্রধান স্মিতা পান্ডের কাছে ট্যাংরা কসাইখানা কবে চালু হবে এবং গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের অনুমতিপত্র কবে নবায়ন করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি পশু সম্পদ উন্নয়ন বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত।’
তবে পশু সম্পদ উন্নয়ন বিভাগের অধীনে পশুপালন ও পশুচিকিৎসা সেবার পরিচালক নিখিল কুমার শিট জানান, কলকাতা পৌর করপোরেশনই কসাইখানা ও অনুমতিপত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিমবঙ্গে গরুর মাংসের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে অন্যান্য জেলায়ও। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুর শহরে মে মাস থেকে স্থানীয় বাজারে সকাল ১১টার মধ্যে গরুর মাংস শেষ হয়ে যায়।
কলকাতার একটি সেলুনে হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ করা বারুইপুরের বাসিন্দা সায়েদ সাইফুল্লা বলেন, ‘কিছু দিন গরুর মাংস একেবারেই থাকে না।’
তিনি জানান, মে মাস পর্যন্ত মাছ ও খাসির মাংসের দাম বাড়লেও গরুর মাংসের দাম স্থির ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
নিজের পরিবারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সারা জীবন প্রায় প্রতিদিনই গরুর মাংস খেয়েছি। এখন তা কমে সপ্তাহে একবার বা দুবারে নেমে এসেছে।’
খাদ্যের পেছনে পরিবারের সাপ্তাহিক খরচ মে মাসের আগের ৫ হাজার রুপি থেকে বেড়ে ৭ হাজার রুপিতে পৌঁছানোয় খরচ কাটছাঁট করেও স্বস্তি মেলেনি। সায়েদ সাইফুল্লা প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের আয় তো আর সেভাবে বাড়ছে না, তাই না?’
এদিকে উত্তর-পশ্চিমের জেলা মালদহে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা।
তিনি বলেন, ‘আপনার পরিচিত কারও যদি গরু থাকে, তবে আপনি তাদের কাছে গরুর মাংস চাইতে পারেন। তখন তারা গভীর রাতে গরু জবাই করে আপনার বাড়ির দরজায় মাংস পৌঁছে দিয়ে যায়।’


