ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এখন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত। সড়কের পাশে শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানানো পোস্টার। সম্মেলন উপলক্ষে দেশটির রাজধানীতে যান চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, সপ্তাহের শেষ দিকে এই সম্মেলনে ১১ সদস্যের ব্রিকস জোটের নেতারা অংশ নেবেন। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের উত্তেজনা; এই তিন বড় সংকটের মধ্যে নিজেদের ঐক্য ও কার্যকর ভূমিকার সক্ষমতা দেখাতে চলেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস।
এমন পরিস্থিতিতে সম্মেলনটি আয়োজক দেশ ভারতের জন্য একদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব ধরে রাখার একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এরইমধ্যে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সম্মেলনের ফাঁকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও দুই দিনের এই সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে সফর করবেন বলে জানা গেছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ৭ বছর পর এটি হতে যাচ্ছে ভারতে শিয়ের প্রথম সফর। সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাও এবারের সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রিকস হলো বড় উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি জোট। এর নাম এসেছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষর থেকে। শুরুতে পাঁচ দেশ নিয়ে যাত্রা করা এই জোট এখন সম্প্রসারিত হয়ে ১১ সদস্যের দেশে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। পাশাপাশি বিশ্বের জ্বালানি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের বড় অংশও এই দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনও স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আরও প্রভাবশালী ভূমিকা চাইলেও সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের ভেতরের মতপার্থক্য এবারের সম্মেলনে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্য ইরান, অন্যদিকে রাশিয়া এই জোটের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। চীনের সঙ্গে উভয় দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবার ভারত একই সঙ্গে রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।
এই বৈচিত্র্যের কারণে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সংকটে ব্রিকসের পক্ষে শক্তিশালী অভিন্ন অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জোটটিতে এমন দেশ রয়েছে যাদের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও রয়েছে। যেমন ভারত ও চীন, ইরান ও সৌদি আরব, মিসর ও ইথিওপিয়া।
আন্তর্জাতিক সংকটবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোনথি বলেন, ‘বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো কোনো একক বা অভিন্ন সত্তা নয়। তাই এসব সংঘাত মোকাবিলা ও মধ্যস্থতায় ব্রিকসের জন্য ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হবে।’
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এরই মধ্যে ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। দিল্লি প্রকাশ্যে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন দিতে পারে না। জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে একদিকে দিল্লি যেমন মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে , একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও আরও গভীর করেছে ভারত।
ইউক্রেন ইস্যুতে ভারত ধারাবাহিকভাবে কোনো পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন: শিয়ের ভারত সফর/ কূটনৈতিক বরফ গললেও অনিশ্চিত বাণিজ্যিক অগ্রগতি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতও ব্রিকসের জন্য একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তাদের স্বার্থ এক নয়। ফলে এই বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নেওয়া কঠিন।
অবশ্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে চীন ও রাশিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ভারত এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও তেহরানের সঙ্গে নিজস্ব টানাপোড়েন রয়েছে।
ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার একটি সুযোগও। ২০২০ সালে সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে চীন এখনো ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। শিয়ের সফর সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি আরও শক্তিশালী করলেও দুই দেশের বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফেরার স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
প্রবীণ দোনথি বলেন, ‘আসন্ন সম্মেলন ভারতের জন্য চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করবে।’
ভারত চায় না ব্রিকস সরাসরি পশ্চিমাবিরোধী কোনো জোটে পরিণত হোক। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করেছে ভারত। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও বজায় রেখেছে।

দোনথির ভাষায়, ‘ভারত কৌশলগত স্বাধীনতা তুলে ধরতে চায়। এ কারণে পশ্চিমা জোটের বাইরে থাকা একটি গোষ্ঠীর অংশ হয়েও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়, যদিও চীন তার প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী।’
ব্রিকসের অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো।
সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং এমন অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছে, যা পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর এই উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থব্যবস্থায় ডলারের গভীর অবস্থানের কারণে এর বিকল্প তৈরি করা কঠিন। এ ছাড়া ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর মুদ্রা, আর্থিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার একে অপরের থেকে আলাদা।
অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক মহেশ সচদেব বলেন, ডলারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া ব্রিকসের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, কারণ এই ব্যবস্থা অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তবে আমরা সরাসরি সংঘাতের কথা বলছি না। এটি কোনো একমুখী পরিস্থিতি নয়।’
ব্রিকসের সদস্য বাড়ায় বিশ্বে জোটটির প্রভাবও বেড়েছে। তবে এর প্রকৃত শক্তি নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপে কতটা একমত হতে পারে তার ওপর।
জোটটি বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও প্রতিনিধিত্ব এবং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পথ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
মহেশ সচদেব বলেন, ব্রিকসের প্রয়োজন ‘আরও সমন্বিত মনোভাব এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আরও ভালো ঐক্য। যদি এটি শুধু নিয়মিত বৈঠক ও ছবি তোলার জায়গা হয়ে থাকে, তাহলে এর গুরুত্ব কমে যাবে।’


