আবাসন, খাবার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার মতো বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ না করেই এক বছরের মেয়াদ শেষ করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) শিবির সমর্থিত প্যানেল।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের আগে ‘ঐক্যবদ্ধ ছাত্র জোট’ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৬ দফার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। সেখানে সবার জন্য সিট, ভালো খাবার, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, প্রশাসনিক সংস্কার এবং ক্যাম্পাসে সহিংসতার বিচারের মতো নানা আকর্ষণীয় কথা বলা হয়।
চোখধাঁধানো এসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিল এই প্যানেল। কিন্তু মেয়াদকালের শেষ দিন ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দেখা যাচ্ছে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
মেয়াদ শেষে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, মুখে বলা কথা আর কাজের মধ্যে ব্যবধান বিশাল। তবে শিবির নেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা না করার কারণেই তারা কাজগুলো শেষ করতে পারেননি।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, প্রশাসন কখনোই চায়নি তারা সফল হোক। তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তারা কোনো সাহায্য করেনি।
তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ইশরাত জাহান ইমু। তার মতে, ইশতেহারের অনেক কথাই ছিল অবাস্তব, যা স্রেফ লোক দেখানোর জন্যই দেওয়া হয়েছিল।
একই কথা বলেন মাস্টারদা সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোনোয়ার হোসেন প্রান্ত। তার অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়ে তা পূরণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এই প্যানেল।
উল্লেখ্য, নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছিল শিবির সমর্থিত এই প্যানেল। ২৫টির মধ্যে ২৩টি পদই তারা জিতে নেয়, যার মধ্যে ৯টি ছিল সম্পাদকীয় পদ। এ ছাড়া বেশিরভাগ হলে তাদের প্যানেলই জয়ী হয়।
অধরা আবাসন প্রতিশ্রুতি
প্রথম বর্ষ থেকেই সব শিক্ষার্থীর জন্য সিটের ব্যবস্থা করা ছিল শিবির সমর্থিত ডাকসুর অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। এ জন্য সাময়িক হোস্টেল, মাসে মাসে আবাসন ভাতা দেওয়া এবং নতুন হল বানানোর কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু হল প্রাধ্যক্ষদের স্পষ্ট কথা, সব ছাত্রের সিট দেওয়া একেবারেই অসম্ভব।
শামসুন নাহার হলের এক ছাত্রী জানান, ভর্তির এক বছর পরও তিনি কোনো সিট পাননি। প্রথম ছয় মাস ৩ হাজার টাকা করে ভাতা পেলেও পরে তা হুট করে বন্ধ হয়ে যায়।
এই ভাতা না পাওয়ার বিষয়ে ফরহাদ বলেন, তালিকা না দিলে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না। তিনি আরও দাবি করেন, ছয়টি একাডেমিক ভবন ও নয়টি হলের জন্য ২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার যে বাজেট হয়েছে, তা তাদের চেষ্টাতেই এসেছে।
তবে মূল বিষয় হলো, এই প্রকল্প ডাকসু নির্বাচনের দুই মাস আগেই, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একনেকে পাস হয়েছিল।
সূর্য সেন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিশু এ নিয়ে কটাক্ষ করে বলেন, আগে থেকে পাস হওয়া বাজেটের কৃতিত্ব এখন নিজেদের বলে চালিয়ে দিচ্ছে শিবির।
নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে ব্যর্থ
ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ছাত্রী হলে ঢোকার কড়াকড়ি কমানো হবে, অনাবাসিক ছাত্রীরাও পরিচয়পত্র দেখিয়ে হলে ঢুকতে পারবে এবং অভিভাবকদের জন্য বসার রুম (লাউঞ্জ) তৈরি করা হবে।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছেন, এসবের কিছুই হয়নি।
‘অবরোধবাসিনী’ নামের একটি সংগঠন জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭ শতাংশ ছাত্রী এখনো হলের সুবিধা পান না। তা ছাড়া হলের ফি দেওয়ার পরও অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশে বাধা ও রাতে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
রোকেয়া হলের এক ছাত্রী বলেন, এক হলের মেয়ে অন্য হলে থাকা তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারে না। আর অভিভাবক লাউঞ্জ তো দূর অস্ত, সেটির নামও তিনি শোনেননি।
এই দায়ও প্রশাসনের ঘাড়েই চাপিয়েছেন ফরহাদ। তার দাবি, হলে ডিজিটাল গেট বসানো কিংবা স্পনসরশিপের মাধ্যমে কাজ করার প্রস্তাব প্রশাসন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, হলে পুরুষ কর্মী কমানো কিংবা প্রক্টোরিয়াল টিমে নারী সদস্য বাড়ানো—এর কোনোটিরই দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
খাবারের মানে পরিবর্তন নেই
হলে ও ক্যাফেটেরিয়ায় উন্নত খাবার নিশ্চিত করা ছিল তাদের আরেকটি বড় ওয়াদা। পুষ্টিবিদ দিয়ে খাবারের তালিকা করা, নিয়মিত পরীক্ষা করা, কম দামে খাবার দেওয়া এবং গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য মিল ভাউচার চালুর কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। খাবারের মান আগের মতোই খারাপ রয়ে গেছে। গত এক বছরে হলের খাবারে পোকা, ব্লেড, তেলাপোকা এমনকি কাঁকড়া পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্র মুস্তাকিম বিল্লাহ টাইমসকে বলেন, এই খাবারে ন্যূনতম পুষ্টিও নেই। মান আগেও যা ছিল, এখনো তাই আছে।
খাবার পরীক্ষার ১ লাখ টাকা প্রশাসন দেয়নি বলে দাবি ফরহাদের। তার আরও অভিযোগ, স্পনসরশিপ আনার সুযোগও দেওয়া হয়নি। আর মিল ভাউচার দেওয়ার কাজ হলের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। অনুষদগুলোতে নতুন ক্যাফেটেরিয়া তৈরির পরিকল্পনাও অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
ভেস্তে গেছে ডিজিটাল সেবার প্রতিশ্রুতি
রেজিস্ট্রার ভবনকে কাগজমুক্ত (পেপারলেস) করা এবং সব সেবার জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কিছুই দেখা যায়নি।
ফরহাদ জানান, তারা ঢাবি অ্যাপের মাধ্যমেই পরীক্ষার ফল, সার্টিফিকেট ও ফি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উপাচার্য রাজি হননি, এমনকি বাইরে থেকে অ্যাপ বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে রেজিস্ট্রার ভবনের ডিজিটাইজেশনের কাজ শেষের পথে বলে দাবি করেন তিনি।
বিচারের আশ্বাস অমীমাংসিত
সাম্য, তোফাজ্জল ও আবু বকর হত্যার বিচারসহ ক্যাম্পাসের সহিংসতার বিচারের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তাও থমকে আছে।
এই ব্যর্থতার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি সরকারকে দায়ী করে ফরহাদ বলেন, তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলেও সরকার আসল তথ্য প্রকাশ করছে না।
পপুলেশন সাইন্স বিভাগের ছাত্র শাহরিয়ার কবির বলেন, সাম্য হত্যার বিচার চাওয়া তাদের মূল দাবি ছিল। কিন্তু এক বছরেও কোনো অগ্রগতি না হওয়া খুবই দুঃখজনক।
ডাকসুর এক বছরের কাজের মধ্যে কিছু কর্মশালা ও ৪৫০ জন শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে ইংরেজি শেখানোর কথা উল্লেখ করেন ফরহাদ।
তবে জাতীয় ছাত্র শক্তির ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাকিব বলেন, ডাকসুর মূল কাজই ছিল প্রশাসনের সঠিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আর ঠিক সেখানেই তারা সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে।


