রাজনীতিবিদদের কথায় আস্থা রাখা খুবই কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে আইন করা হবে বলে আইনমন্ত্রী জাতিকে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের কথায় আস্থা রাখা খুবই কঠিন।’
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
বিচারপতি মইনুল বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে জনগণের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি মনে করে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করছে, তাহলে সেটি ইতিবাচক। কিন্তু যদি তারা মনে করে বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি একে অপরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। বিচারকদের গুরুতর অসদাচরণ ছাড়া অপসারণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। জবাবদিহিহীন বিচার বিভাগ জনআস্থা হারায়, আবার স্বাধীনতাহীন বিচার বিভাগ কোনো বিচার বিভাগই নয়।’
গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিচারকদের স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার প্রত্যাশাই গণআকাঙ্ক্ষা। বিচার বিভাগ সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত–সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সংসদ এ আইনগুলোকে সুরক্ষা দেবে।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ধারণা হঠাৎ তৈরি হয়নি, এটি দীর্ঘ সংগ্রাম ও শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ফল।’
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার ভালো আইন করার আশ্বাস দিলেও তা নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, মাসদার হোসেন মামলার রায় কোনো সরকারই বাস্তবায়ন করেনি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এখনো পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি নির্বাচিত গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। সেখানে কোনো নারী সদস্যও ছিল না। বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও নারী আইনজীবী বা বিচারপতির অংশগ্রহণ ছিল না।’ তিনি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পুনর্বহালের পক্ষে মত দেন।
ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন প্রশ্ন তোলেন, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ কেন বাতিল করা হলো–সরকার এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে রায়ের ২৭ বছর পরও এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা দুঃখজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতা।’


