নদীর তলদেশ দিয়ে তৈরি দেশের প্রথম মেগা প্রজেক্ট কর্ণফুলী টানেল এখন সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা। যে আশা নিয়ে এই টানেল করা হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। এর পেছনে মূল কারণ ভুল ট্রাফিক জরিপ, সংযোগ সড়কের অভাব এবং নদীর আনোয়ারা প্রান্তে সময়মতো শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠা।
হিসাব করে দেখা গেছে, ধারণার মাত্র ১৪ শতাংশ যানবাহন এখন টানেল দিয়ে চলাচল করছে। ফলে টোল থেকে যে টাকা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে টানেল চালানো এবং দেখভালের খরচই উঠছে না। এতে প্রতি মাসে সরকারের লোকসান হচ্ছে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এই ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের কথাও বলা হয়েছে।
আইএমইডি জানায়, ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমীক্ষায় চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রামকে ‘এক নগর, দুই শহর’ বানানোর স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের জট কমানো এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ তৈরি করা।
২০১৫ সালে যখন প্রকল্পটি পাস হয়, তখন খরচ ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। দুইবার প্রকল্প সংশোধন করে সেই খরচ ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। শুধু খরচই বাড়েনি, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ও লেগেছে দ্বিগুণ। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও টানেল চালু হতে হতে ২০২৪ সালের জুন পার হয়ে যায়।
আগে ধারণা করা হয়েছিল, চালুর পরপরই টানেল দিয়ে প্রতিদিন ১৭ হাজার গাড়ি চলবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা ২৮ হাজার ৩০০ ছাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন মাত্র চার থেকে সাড়ে চার হাজার গাড়ি চলছে। এর মধ্যেও বেশির ভাগই প্রাইভেটকার আর হালকা গাড়ি, যার কারণে টোল থেকে আয় অনেক কমে গেছে।
আইএমইডি বলছে, ২০১৩ সালের জরিপটিই ছিল ভুল। বাস্তবে রাস্তায় কত গাড়ি চলে তা না মেপে, স্রেফ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ওই হিসাব করা হয়েছিল।
বর্তমানে টানেল থেকে প্রতিদিন টোল আদায় হয় গড়ে ১২ লাখ টাকা। অথচ এটি চালাতে প্রতিদিন খরচ হয় ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ, আয়ের টাকা দিয়ে খরচের মাত্র অর্ধেক মেটানো যাচ্ছে। প্রতি মাসে লোকসান হচ্ছে ৩ কোটি টাকারও বেশি।
টানেল চালানোর জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো দক্ষ জনবল নেই। সেতু কর্তৃপক্ষের কোনো স্থায়ী টেকনিক্যাল টিম না থাকায়, পুরো বিষয়টি এখনও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আইএমইডি সতর্ক করে বলেছে, এভাবে বিদেশি নির্ভরতা থাকলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ আরও বাড়বে।
এছাড়া, টানেলের পাশে প্রায় ৪৮৪ কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল বাংলো, মোটেল ও কনভেনশন সেন্টার (সার্ভিস এরিয়া) বানানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টানেলের কাজের সাথে এর কী সম্পর্ক, তা পরিষ্কার নয়।
সরকারি অডিটে এই প্রকল্পে ৬৮টি আপত্তি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪৮টিই বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম। যেমন কোনো যৌক্তিকতা ছাড়াই ৫০ কোটি টাকায় সার্ভিস এরিয়া বানানো, ২৫ কোটি টাকার বাড়তি খরচ এবং নিয়ম না মেনে কোটি কোটি টাকার বাড়তি বিল দেওয়া। আইএমইডি বলেছে, সরকারি কেনাকাটার নিয়ম না মানায় এসব সমস্যা হয়েছে যা দ্রুত সমাধান করা দরকার।
এই টানেলকে লোকসান থেকে বাঁচাতে আইএমইডি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে। তারা মাতারবাড়ী বন্দরের সাথে সংযোগকারী ৭৪ কিলোমিটার সড়ক দ্রুত শেষ করার এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-সাতকানিয়া সড়কটিকে চওড়া করার তাগিদ দিয়েছে। একই সাথে আনোয়ারার শিল্পাঞ্চলের কাজ দ্রুত শেষ করে ব্যবসায়ীদের এই রুট ব্যবহারে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল টোল ব্যবস্থা চালু করা, মালবাহী ট্রাকের রুট ঠিক করা, পড়ে থাকা মোটেল ও কনভেনশন সেন্টারগুলো আন্তর্জাতিক হোটেলের কাছে ভাড়া দেওয়া এবং দেশের নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর দিয়েছে আইএমইডি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, মেগা প্রকল্প নেওয়ার আগে অনেক বেশি সাবধান হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘শুধু টানেল বানালেই হয় না, তার সাথে জড়িত অন্যান্য কাজও শেষ করতে হয়। তা না হলে প্রকল্প লাভজনক হয় না। কর্ণফুলী টানেলের মূল আশাই ছিল আনোয়ারায় একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে। সেখান থেকে যে মালামাল ও গাড়ি আসবে, সেটাই ছিল আয়ের মূল উৎস। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি সময়মতো না হওয়ায় দৈনিক ১৭ হাজার গাড়ির জায়গায় মাত্র ৩ থেকে ৪ হাজার গাড়ি চলছে।’
মুস্তাফিজ আরও বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল বিষয়ে খরচের বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক হওয়া দরকার ছিল। যেমন ৫০০ কোটি টাকা দিয়ে যে সার্ভিস এরিয়া বানানো হলো, তা এখন সরকার ভাড়া দেওয়ার জন্য লোক খুঁজছে। এই ধরনের বাড়তি খরচ শুরুতেই ঠেকানো উচিত ছিল।’
তিনি বলেন, মূল প্রকল্পের সাথে বাকি কাজগুলোও একসাথে শেষ করার শিক্ষা নেওয়া উচিত। তা না হলে বড় বড় অবকাঠামো এভাবে লোকসানের ফাঁদে পড়বে।


