জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর বিরুদ্ধে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগ তুললেও, তার নিজের দলের সদস্যদের বিরুদ্ধেই হয়রানি, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অসংখ্য অভিযোগ জমা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দেশের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে জামায়াত ও শিবির কর্মীদের জড়িয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তত ৫০টি অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব মামলার কয়েকটিতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
বেশ কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দু’একটি ঘটনায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বেশিরভাগ অভিযোগের ক্ষেত্রেই দল থেকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নারী অধিকার কর্মী এবং জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, জামায়াত আমিরের কিছু বক্তব্যে নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক অবস্থান দেখা গেলেও, বাস্তবে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা জামায়াতের কথার সাথে কাজের এক চরম বৈপরীত্য তুলে ধরছে।
এই বিতর্কের রেশ খোদ জামায়াত আমিরের নিজের মন্তব্যেও দেখা গেছে। গত ৩১ জানুয়ারি শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা একটি পোস্ট নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেই পোস্টে লেখা ছিল, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে আধুনিকতার নামে নারীদের যখন ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। এটি পতিতাবৃত্তিরই আরেকটি রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।’
ওই রাতেই জামায়াতে ইসলামী দাবি করে যে তাদের আমিরের অ্যাকাউন্টটি হ্যাকারদের কবলে পড়েছিল। তবে সমালোচকরা বলছেন, ওই পোস্টের আগেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড জামায়াতের নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল।
সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো নারী কখনো জামায়াতের সর্বোচ্চ পদে বসতে পারবেন কি না। তিনি পরিষ্কারভাবে উত্তর দেন যে এটি ‘সম্ভব নয়’।
এর আগে ২৪ জানুয়ারি বরগুনায় একটি নির্বাচনী সভায় জামায়াতের জেলা সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (ডাকসু) সাবেক ‘পতিতালয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই মন্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পরবর্তীতে দল তাকে সব দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, নির্বাচনের আগে এই ধরনের ভয়ভীতি ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে তারা ক্ষমতায় আসলে শাসনব্যবস্থা কেমন হতে পারে।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘নির্বাচনের আগেই যদি কেউ হুমকি বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তবে এটা ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে তারা জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসলে আরও কঠোরভাবে শক্তি প্রয়োগ করবে।’
তানিয়া হক আরও বলেন, যারা ক্ষমতায় থাকে তারা প্রায়ই অন্যদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে এ ধরনের নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করতে না পারে, তবে এই ধরনের সহিংসতা চলতেই থাকবে এবং আরও বাড়বে।
জামায়াত নেতাদের কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য নারীদের নিয়ে জামায়াতের ঘোষিত অবস্থানকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এমনকি দলটির নারী-সংক্রান্ত বিশেষ উদ্যোগগুলো নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি জামায়াতের একটি নারী সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত করা হয়। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায়, অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে তারা সমাবেশটি পেছাতে বাধ্য হয়েছে।
দলের নারী শাখার সদস্য মারদিয়া মমতাজ জানান, নিরাপদ কোনো জায়গা না পাওয়ায় এবং নির্বাচনের কাজের চাপের কারণে তারা সমাবেশটি করতে পারেননি।
টাইমস অব বাংলাদেশ এ নিয়ে কথা বলতে জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের প্রধান আহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ ফোন ধরলেও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নির্যাতনের যত অভিযোগ
গত এক বছরে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন সহিংসতার মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন।
গত ১১ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকে আদালত কারাগারে পাঠায়। অভিযুক্ত আবদুর রহিমের বয়স ৪০ বছর এবং তিনি চর মোহনা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। শিশুটির মা গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর মামলাটি দায়ের করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয় যে, অভিযুক্তের বাড়িতে তার মেয়েকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে।
গত বছরের ২৮ অক্টোবর দায়ের করা অন্য একটি মামলায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে দুই দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী নারী বালিপাড়া ইউনিয়নের নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন।
এ বিষয়ে ইন্দুরকানী উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলী হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, নাসির উদ্দিন আগে জামায়াতের ইউনিয়ন আমির ছিলেন। কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ২০২৩ সালে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, বহিষ্কারের কথা বলা হলেও নাসির উদ্দিন এখনো দলের ‘রুকন’ পদে আছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন সভা ও কর্মসূচিতে তাকে বেশ সক্রিয় দেখা গেছে।
শিশুদের ওপর নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতারা আইনের আশ্রয় না নিয়ে সালিসের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ১৩ অক্টোবর পিরোজপুরের নাজিরপুরে ৭০ বছর বয়সী মো. দিনু ফকিরের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় জামায়াত নেতারা সেখানে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে ‘মীমাংসা’ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনায় যখন আইনের বদলে নিজেদের মতো মীমাংসা করা হয়, তখন তা অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
গত বছরই ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার খোকসায় তৃতীয় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত জামায়াত কর্মীকে নামমাত্র শাস্তি দিয়ে বিষয়টি ‘নিষ্পত্তি’ করার অভিযোগ ওঠে।
একই বছর ২১ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায় এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে জামাল উদ্দিন (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। স্থানীয়রা তাকে জামায়াত কর্মী হিসেবে শনাক্ত করে, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তিনি অপরাধ স্বীকার করেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীতে এক জামায়াত নেতার মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় শিবির নেতা হামিদুল রহমান আজাদকে (২৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, তিনি উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন; বর্তমানেও জেলা পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
গত বছর ৬ জুন নাটোরের বড়াইগ্রামে এক নারী পুলিশের কাছে মামলা করেন যে, তাকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং জোর করে তালাকনামায় সই নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন বড়াইগ্রাম সদর ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ হারুন খান ও হাসনুর রহমান হাসান। বড়াইগ্রাম থানার পুলিশ পরিদর্শক গোলাম সারোয়ার গণমাধ্যমের কাছে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সবশেষ ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুরে ১০ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্ত মোসলেম উদ্দিন (৪২) স্বরূপপুর ইউনিয়ন জামায়াতের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক। ঘটনার সময় স্থানীয় মানুষ তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং মারধর করার পর পুলিশের হাতে তুলে দেয়।


