২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার বিকালে এসডিজি অর্জনের তিন দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়নের অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে আসুন আমরা সবাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করি।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণ বিষয়ক জাতীয় সম্মেলন: নীতি, অংশীদারিত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই সম্মেলন হয়।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আশা করি, এসডিজি ভিলেজ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত “ডেভেলপমেন্ট মডেল” হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে গড়ে উঠবে। কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’
এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা।
‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর—এই তিনটি গ্রামকে এসডিজি স্থানীয়করণের একটি পাইলট মডেল কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এই তিনটি গ্রামের এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন এবং এই কার্যক্রমের সুফল সম্পর্কে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা অধীর আগ্রহে শুনেন। তিন দিনের জাতীয় কর্মশালার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি, তিনদিনের এই সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’
আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে থাকবে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা; একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তপ্রজন্ম ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।
সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক এবং গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট এবং বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
পরীক্ষামূলক প্রকল্প
এসডিজির পাইলট প্রকল্প সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই গ্রামগুলোতে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ব্লু এমপ্লয়মেন্ট, ওয়ান ভিলেজ-ওয়ান প্রোডাক্ট, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকোট্যুরিজমসহ বিভিন্ন কর্মসূচি একযোগে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই উদ্যোগের সাফল্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সারা দেশের অন্যান্য গ্রামেও এই মডেল সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ যেভাবে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল-এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলো, একইভাবে সাস্টেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথাযথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে চলছে।
তিনি বলেন, আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন, এসডিজির প্রতিপাদ্য ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এই মূলনীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে। সকল শ্রেণি-পেশা তথা জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
বিএনপির জননীতির দিকে লক্ষ্য করলেই এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে সকল সময়েই বিএনপির সকল পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি জনবান্ধব। যেমন দেশ এবং জনগণের উন্নয়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা—ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিটি ভিশন এবং মিশনের সঙ্গে এমডিজি কিংবা বর্তমানের এসডিজির খুব বেশি অমিল নেই।
দেড় যুগের অবস্থা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা সবাই জানেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসনে বাংলাদেশকে একটি ঋণনির্ভর এবং আমদানি নির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সকল ক্ষেত্রে ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রটি এবার পুনর্গঠনের পালা।
দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রাপথে অবশ্যই এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। এরই অংশ হিসেবে, জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এই ফ্রেমওয়ার্ক দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সঙ্গে সমন্বিত করেছে। বর্তমান সরকারের গৃহীত সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসন—এসডিজির এই মূল অগ্রাধিকারগুলোই প্রতিফলিত হয়েছে।
থ্রি আর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করতে বর্তমান সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন’ এই থ্রি-আর (ত্রি আর) কৌশল গ্রহণ করেছে। যার মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর—সবকিছুই একটি সুসংহত পথনকশায় বাস্তবায়িত হবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জনগণের রায়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়গুলো তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো না কোনো উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে। এভাবে চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় এবং আর্থিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সুচিন্তিত পথনকশা সরকারের রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই সম্মেলনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি ও পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেঝনিয়াক বক্তব্য দেন।


