চাকসু: চটকদার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে সাফল্য সীমিত

চাকসু: চটকদার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে সাফল্য সীমিত
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের আগেও ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল এমন সব প্রতিশ্রুতি পূরণের আশ্বাস দিয়ে ভোট নিয়েছে, যা এখন আর পূরণ করতে পারছে না। মেয়াদের শেষ বেলায় এসে দায় চাপাচ্ছে প্রশাসনের ওপর।

২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবরের এই নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ ১২ মাসে ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ ৩৩ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

নির্বাচনে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই জয় পায় প্যানেলটি। পরে ২৩ অক্টোবর তারা শপথ গ্রহণ করে। দশম মাসে এসে দেখা যাচ্ছে, প্রধান যে প্রুতিশ্রুতিগুলো শিক্ষার্থীদের ভোট প্রদানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে, সেগুলোরই বাস্তবায়ন হয়নি সেভাবে।

শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেছিল আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণ, বিদ্যমান হলের সংস্কার, এক্সটেনশন ব্লক বৃদ্ধি, নতুন আসন সৃষ্টি এবং সিট বণ্টন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো।

ইশতেহার ঘোষণা করে প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মো. ইব্রাহীম হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচিত হলে প্রথমেই আবাসন–সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদ্যমান হলগুলো সংস্কার, এক্সটেনশন ব্লক বৃদ্ধি ও নতুন টিনশেড নির্মাণের মাধ্যমে হলে অন্তত ১০ শতাংশ আসন বৃদ্ধি করার জন্য প্রশাসনকে বাধ্য করা হবে। পাশাপাশি হলের আবাসন বণ্টনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।’

স্থায়ী সমাধান হিসেবে অধিক শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বহুতল হল নির্মাণ করার কথাও বলা হয় ইশতেহারে।

কিন্তু নতুন কোনো হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১২টি হলের মধ্যে কেবল দুটি সংস্কার হয়েছে। কোনো এক্সটেনশন ব্লক বৃদ্ধি হয়নি। টিনশেডও নির্মাণ হয়নি।

সোহরাওয়ার্দী হলের পরিত্যক্ত যে ভবনটি সংস্কার হয়েছে, তাতে ছয়টি কক্ষে ১৯ জন শিক্ষার্থী উঠতে পারবে। ফরহাদ হোসেন হলের শিক্ষক কোয়ার্টার শিক্ষার্থীদের জন্য অবমুক্ত করে দেওয়া হয়েছে যেখানে ৮৮জন শিক্ষার্থী উঠেছে।

আশার বেলুন ফুটো হয়ে যাওয়ার পর স্বভাবতই শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মো. নাঈম বিশ্বাস টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইশতেহারের ভাষা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, গবেষণা বাজেট, এমনকি জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। ক্লাস, পড়াশোনা ও জীবনের সংগ্রামের ভিড়ে শত শত প্রতিশ্রুতির আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা যাচাই করার সুযোগ সবার থাকে না। একে কাজে লাগিয়ে এখতিয়ারবহির্ভূত ও কার্যত অসম্ভব প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনী হাতিয়ার বানানো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’

জানতে চাইলে চাকসু জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, ‘এক বছরে বছরে ভবন তুলে ফেলা সম্ভব না হলেও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কাজগুলো যেহেতু সরকারি সেহেতু একটা প্রসেসিংয়ের ব্যাপার থাকে। আশা করি, আমাদের সময়ের মধ্যেই একটা ঘোষণা দিয়ে যেতে পারব।’

জেনেশুনে তাহলে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক হাজার আসনের ১০টি হল বৃদ্ধির জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। এর বাজেট সরকার থেকে অনুমোদন ও বরাদ্দ দিলে আমরা হয়ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পারব।’

আরও পড়ুন

আলোচিত আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র-টিএসসি ও কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নির্মাণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতিই নেই। চাকসুর মেয়াদের তিন মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব, এমন আশাও কেউ করছে না।

শিক্ষার্থীদের জন্য অন-ক্যাম্পাস জব চালু, অফিসিয়াল ই-মেইল প্রদান, প্রিমিয়াম অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ, মেন্টাল হেলথ কাউন্সিল গঠন, শহর ও উপজেলা পর্যায়ে বাস সার্ভিস চালু, শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়ন ও বিভাগীয় লাইব্রেরি ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।

নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন প্রোডাক্ট সহজলভ্য করা, ফ্যাকাল্টির মসজিদে নারীদের আলাদা স্থান, পৃথক ওয়াশরুম, ক্যানটিনে পর্দা কর্নার, লেডিস ঝুপড়িতে সুপারশপ ও ফার্মেসি স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি।

অ্যালামনাইদের সঙ্গে সমন্বয়, হলভিত্তিক জিম, মাঠ সংস্কার, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চাইল্ড কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার, কটেজ-মেস তদারকি, সুলভ মূল্যের খাবার নিশ্চিত করতে ফুড সেল গঠন এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সাক্ষরের মতো প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

চাকসু জিএস বলেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টায় অনেকগুলো কাজ হয়েছে এবং মোটামুটি একটা পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ক্যাম্পাসে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতা নেই এবং ক্যাম্পাসে প্রত্যেকটি হলে প্রশাসনের মাধ্যমে সিট বণ্টন হচ্ছে।’

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া সিদ্দিক এই কিছু কিছু কাজে সন্তুষ্ট নন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এরা বলে যে, আমাদেরকে প্রশাসন হেল্প করছে না, বা আমাদের বাজেট নেই। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে এই জিনিসটা আসলে প্রশাসন থেকেই আমরা যথেষ্ট শুনেছি। আমরা এগুলো শুনতে শুনতে বিরক্ত।’

বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারকে ৩০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর, অপারেশন থিয়েটার স্থাপন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ ও জরুরি মেডিকেল হেল্পলাইন চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

চাকসু জিএস বলেন, ‘এটা নিয়ে আমাদের কাজ চলছে। আমরা আশা করি আমাদের অনুজরা এটার ফল পাবে।’

সেশনজট নিরসনে একাডেমিক ক্যালেন্ডার কার্যকর করা, পরীক্ষা-রুটিন-ফল প্রকাশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

বিশ্লেষণে দেখা গেছে ৩৩টি দফার মধ্যে ১২টি ছোটখাট প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ বা উল্লেখযোগ্যভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা মোট ইশতেহারের ৩৬ শতাংশ। ৪টি আংশিক বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে, যা মোট ইশতেহারের ১২ শতাংশ। অন্যদিকে ১৭টি বাস্তবায়িত হয়নি, যা মোট ইশতেহারের ৫১ শতাংশ।

চাকসু জানায়, হলগুলো থেকে মার্কশিট ও ফরম উত্তোলনে ২০ টাকা প্রদান করার বিষয়টি বাতিল হয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু ও সহজ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি ফ্রি মেডিকেল ও মেডিসিন ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলে অ্যাম্বুলেন্স বৃদ্ধি, প্রতিটি হলে ফার্স্ট এইড বক্স স্থাপন এবং বেসরকারি মেডিকেল প্যাথলজিতে চবি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

পরিবহন ব্যবস্থায় জোবাইক চালু এবং শাটল ট্রেনে নতুন বগি সংযোজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছে। যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সাইবার বুলিং সেল গঠন করা হয়েছে।

গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে মাসব্যাপী রিসার্চ ওয়ার্কশপ আয়োজন, মাস্টার্স (থিসিস), এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা এবং গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, জার্মান, জাপানিজ ও ইংরেজি ভাষার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স আয়োজন করা হয়েছে।

প্রশাসনিক অটোমেশন, অনলাইন সেবা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতিও আংশিক পূরণ হয়েছে। ফল প্রকাশ, রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রার ভবনের জটিলতা দূরীকরণসহ পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

শাটল ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন বগি যুক্ত হলেও শাটল ট্র্যাকার অ্যাপ, নতুন শাটল সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং দ্বিতীয় রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad