জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের আগে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট ডাইনিংয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ ভর্তুকি আদায় করে সুলভমূল্যে মানসম্মত খাবার সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করলেও প্রায় ১১ মাসেও তা করতে পারেনি।
কেবল এটি নয়, জোট ৯ দফা যে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছিল, দায়িত্ব গ্রহণের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের পরিমাণ একেবারেই কম, যদিও শিবির সমর্থিত প্যানেলের দাবি, তারা অনেকগুলোই পূরণ করেছে।
২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনে ভিপি বাদে বড় প্রায় সব পদেই জয় পায় ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’। জিএসসহ ২৫টি পদের ২০টিই যায় তাদের বাক্সে।
এই প্যানেল মোট ৯ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে যার মধ্যে ছিল অ্যাকাডেমিক সংস্কার, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসিক জীবন, খাদ্য নিরাপত্তা, নারী নিরাপত্তা, ডিজিটাল অটোমেশন, পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সুবিধা চালু ইত্যাদি।
ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের ১১ মাস পরে এসে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতারা বলছেন, প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তব পরিবর্তন সীমিত। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসিক, নারী নিরাপত্তা, পরিবহন কিংবা পরিবেশ, প্রায় প্রতিটি অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম একাদশ মাসে এসে বলছেন, ‘জনবল সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময় লাগছে।’
ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেছেন, ‘প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে ব্যর্থতা আড়াল করা হচ্ছে।’
তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করাই জাকসুর দায়িত্ব।
জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, ‘জাকসু চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেই চেষ্টা প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি।’
প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ হয়নি
শিবিরের যেসব প্রতিশ্রুতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিল, তা হলো হল ডাইনিংয়ে ভর্তুকি। অর্ধেক মূল্যে খাবার পাওয়ার আশায় অনেকেই শিবিরের প্যানেলকে বেছে নিয়েছেন।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমিত কুন্ডু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে খাদ্য আর ও ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মেয়াদের শেষ বেলায় জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম দাবি করেছেন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ভর্তুকি চালু করা সম্ভব হয়নি। হলগুলোতে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপনের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হলেও অর্থ ছাড় না পাওয়ায় কাজ শুরু হয়নি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল সংসদের ভিপি রাকিবুল হাসানও বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো এ খাতে আলাদা বাজেট বরাদ্দ নেই।’
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ডিজিটাল কুপনভিত্তিক অটোমেশন ব্যবস্থা চালু করা যায়নি বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। তবে এতে তাদের দায় দেখেন না শিবির নেতা। উল্টো ডাইনিং কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার ও কিউআর স্ক্যানিং প্রক্রিয়া নিয়ে অনীহার অভিযোগ এনেছেন।
প্রত্যাশা ছিল একাডেমিক সংস্কার
দীর্ঘদিনের সেশনজট, পরীক্ষা গ্রহণে অনিয়ম, দাপ্তরিক জটিলতা এবং প্রশাসনিক ভোগান্তি দূর করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল তা কি পূরণ হয়েছে? এই প্রশ্নে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইফফাত রাইসা নুহা টাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর অন্তত কিছু মৌলিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হলে শিক্ষার্থীরা আশ্বস্ত হতে পারতেন, কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন চোখে পড়ছে না।’
তার অভিযোগ, পরীক্ষার ফরম পূরণ, বিভিন্ন অনুমোদন কিংবা প্রশাসনিক কাজে শিক্ষার্থীদের একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। ডাকসুর জিএস মাজহারুল দাবি করছেন, তাদের কাজ তারা করেছেন, বাকিটা প্রশাসনের।
তিনি বলেন, ‘সময়মতো পরীক্ষা নিশ্চিত করতে জাকসুর সুপারিশে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা হয়েছে, প্রশাসন তার বড় অংশ বাস্তবায়ন করছে। মানোন্নয়ন পরীক্ষার বিষয়টিও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদনের অপেক্ষায়। শিক্ষকরা নির্ধারিত সূচি অনুসরণ করছেন কি না, তা মূল্যায়নের জন্য কোর্স শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
এখনো যেগুলো উদ্যোগের মধ্যেই সীমিত, সেগুলো মেয়াদের বাকি সময়ে আদৌ পূরণ হবে কি না, সে প্রশ্নে জবাব অবশ্য নেই।
ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়জান আহমেদ অর্কো টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদকের নাম পর্যন্ত জানেন না। কারণ, সংশ্লিষ্ট খাতে তাদের দৃশ্যমান কার্যক্রম খুবই সীমিত।’
‘সেমিনার বা কর্মশালাকে জাকসু অর্জন হিসেবে দেখাতে চাইছে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ, জাকসুর স্বতন্ত্র সাফল্য নয়,’ বলেন তিনি।
ছাত্রদল নেতা জহির উদ্দিন বাবরও মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সামনে যেসব বড় বড় অ্যাকাডেমিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়নি।
‘শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করার মতো মৌলিক পরিবর্তনের বদলে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়েছে মূলত ঘোষণা,’ বলেন তিনি।
জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, ‘আন্তরিক তদারকি থাকলে গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, ক্লাসরুম সংকট নিরসন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব হতো।’
স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারের প্রতিশ্রুতিও অধরা। বিশেষ করে রাতের চিকিৎসক নিশ্চিত করা আর ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। এর মধ্যে মেডিকেল সেন্টারে আবার ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে।
জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য সম্পাদক হুসনে মোবারকও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, আগের অর্থবছরের বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে ওষুধ সংকট তৈরি হয়েছিল এবং নতুন বাজেট অনুমোদনের পর তা স্বাভাবিক হচ্ছে।
জিএস মাজহারুল বলছেন, মেডিকেল সেন্টারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেবা সম্প্রসারণের বড় অংশই প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট ও জনবলের ওপর নির্ভরশীল। তার দাবি, রেজিস্ট্রার দপ্তর, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস ও অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটে জনবল স্বল্পতা থাকায় অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
ছাত্র ইউনিয়ন নেতা অর্কো বলেন, ‘কেবল প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পের কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিই মূল্যায়নের বিষয়।’
শিবির সমর্থিত প্যানেলের আরেক প্রতিশ্রুতি ছিল নারীর নিরাপত্তা।
সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী ইফফাত রাইসা নুহা বলেন, ‘সাইবার বুলিং সেল গঠন ইতিবাচক হলেও বাস্তবে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বহিরাগতদের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের ছবি তোলা ও হয়রানির ঘটনা এখনো ঘটছে।’
তবে জিএস মাজহারুলের দাবি, র্যাগিং, গেস্টরুম সংস্কৃতি ও নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করা হচ্ছে।
নীতিমালা চূড়ান্ত হলে অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, বলছেন তিনি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য র্যাম্প নির্মাণ, অডিও বুক, শ্রুতিলেখক, স্মার্ট আইডি কার্ড, ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন না হওয়ার বিষয়ে তার জবাব, ‘এসব উদ্যোগ চলমান রয়েছে।’
পরিবেশ সংরক্ষণও ছিল ছাত্রশিবিরের প্যানেলের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি।
শিক্ষার্থী ইফফাত রাইসা নুহা ও সুমিত কুন্ডু দুজনেরই মূল্যায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ক্যাম্পাস উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রভাব দৃশ্যমান নয়।
তবে জিএস মাজহারুল বলছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ ইকোলজিক্যাল মাস্টার প্ল্যান অনুমোদিত হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক নথিভুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, প্লাস্টিকবিরোধী প্রচারণা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক নিয়োগ, টিএসসি ও কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের আধুনিকায়নের মতো প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি।


