দায়িত্ব গ্রহণের ১০ মাসের কিছু বেশি সময় পার করে দেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কর্মসূচির চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সংসদের শীর্ষ দুই নেতা মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও সালাউদ্দিন আম্মারদের হুমকি-ধমকির ঘটনায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ২০২৫ সালের বছরের ১৬ অক্টোবরের রাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ এর জয় ছিল ভূমিধস। ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পায় তারা।
রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার অবশ্য কাগজেকলমে ছাত্রশিবিরের নেতা নন। তিনি স্বতন্ত্র প্যনেলের হয়ে ভোটে অংশ নেন, তবে এটি শিবিরেরই ডামি প্যানেল বলে সমালোচনা ছিল। তার প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব।
নির্বাচনের আগে ১২ মাসে ২৪টি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শিবির সমর্থিত প্যানেল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে নয় মাসের মতো পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ।
তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের চেয়ে রাকসুর নেতারা জাতীয় রাজনীতিতেই বেশি সক্রিয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছেন তারা।
নির্বাচনের আগে ২৪ সেপ্টেম্বর শিবিরের প্যানেল সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করে, যাতে সাতটি বিষয়কে হ্যাঁ ও সাতটি বিষয়কে ‘না’ বলা হয়।
অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণে শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ ঘোষণা এবং এর আগপর্যন্ত আবাসন ভর্তুকি দেওয়া ছিল শিবিরের প্যানেলেন প্রধান প্রতিশ্রুতির একটি।
কিন্তু গত ১০ মাসেও জানানো হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ আবাসিক সুবিধা কবে থেকে হবে বা আদৌ হবে কি না। আর অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা কেউ ভর্তুকি পেয়েছেন, এমন উদাহরণও নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আবাসিকের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। রাতারাতি বা এক বছরের মধ্যে শতভাগ আবাসিক নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়।’
তার বক্তব্যে এটি স্পষ্ট, শিবির শিক্ষার্থীদের মন জয়ে অবাস্তব এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ টাইমসকে বলেন, ‘এটি রাকসুর নিজস্ব তহবিল থেকে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তাই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
যেটা পারবেন না, সেই প্রতিশ্রুতি কেন দিয়েছিলেন, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অনাবাসিক ভাতা নিয়ে আমরা বারবার প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। সাতটি নতুন হল নির্মাণের প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠানো হয়েছে; সেটি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তত ভাতা চালুর দাবি জানিয়েছি। শুরুতে প্রশাসন অনীহা দেখালেও এখন বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে।’
রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তী পন্ডিত তুলি টাইমসকে বলেন, ‘রাকসুর ক্ষেত্রে এখন অনেকটা-ফাঁকা কলসি বাজে বেশি-এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগে দীর্ঘ ও আকর্ষণীয় ইশতেহার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব কাজের সঙ্গে সেই ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ক্যানটিনের খাবারের মানোন্নয়ন, শতভাগ আবাসিকতার রোডম্যাপ ঘোষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।’
ফাইন্যান্স বিভগের শেখ তাওহীদ নাঈম বলেন, ‘রাকসুর নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যেই নির্বাচনের সময় এমন কিছু ইশতেহার শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করেন, যেগুলো এক বছরের মধ্যে তো দূরের কথা, কয়েক বছরেও বাস্তবায়ন করা কঠিন। আরও হতাশার বিষয় হলো, যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের রয়েছে, সেগুলোও প্রত্যাশিত গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।’
চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে ২০ শয্যাবিশিষ্ট করা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ারও বা আর্থিক ব্যবস্থাপনা রাকসুর ছিল না। তবু এই কথা বলে ভোট নিয়েছে শিবির। এখন এর বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
একইভাবে প্রশাসনিক সেবা অ্যাপ, অন-ক্যাম্পাস কর্মসংস্থান, পূর্ণাঙ্গ ছাত্র শিক্ষা কেন্দ্র এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কিছুই করা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাদিয়া হক টাইমসকে বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো কবে বা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘ইশতেহার বাস্তবায়নে রাকসুকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হতো। কিন্তু শিবির-সমর্থিতরা সে ধরনের চাপ সৃষ্টিকারী ভূমিকা নেয়নি; বরং রাকসুকে জামায়াতি আদর্শ বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। শিক্ষার্থীদের টাকায় কিছু কাওয়ালী, ইসলামী স্মরণসভা, সেমিনার ও কুইজ প্রতিযোগিতা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু দেখা যায়নি। এতে নেতারা শুধু নিজেদের অযোগ্যতাই প্রমাণ করেননি, শিক্ষার্থীদের কাছেও রাকসুর আবেদন কমিয়ে দিয়েছেন।’
তবে রাকসু শুরু থেকেই নিজেদেরকে সফল দাবি করে আসছে। দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর একটি সেমিনারে রাকসু তাদের ‘১০০ দিনে ১০৩টি কাজ’ শিরোনামে একটি তালিকা প্রকাশ করে। তবে ওই তালিকার অধিকাংশই ছিল কবর জিয়ারত, সৌজন্য সাক্ষাৎ, মতবিনিময় সভা, ক্রীড়া প্রদর্শনী, স্মারকলিপি প্রদান ও কাওয়ালি আয়োজনের মতো কার্যক্রম; শিক্ষার্থীদের মৌলিক সমস্যার সমাধানে বড় কোনো অগ্রগতি সেখানে ছিল না।
ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ টাইমসের কাছে দাবি করেছেন, ইশতেহারের ২৪টি অঙ্গীকারের অধীনে ১০৬টি কর্মসূচির ৫৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বা চলমান। বাকি ৪১ শতাংশ মেয়াদের মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করছেন।
‘৩৬ বছর পর সচল হওয়া একটি ছাত্র সংসদ পরিচালনায় নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তারপরও আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি,’ যোগ করেন তিনি।
কাজ করতে না পারার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই দায়ী করেন তিনি। বলেন, ‘সিনেট বরাদ্দ, লাইব্রেরিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ধীরগতি ও নানা বাধা ছিল। একই সঙ্গে প্রশাসনের অসহযোগিতা ছিল।’
রাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বিরও বলেন, ‘নির্বাচন হওয়ায় দায়িত্ব বুঝে নিতেই কয়েক মাস লেগেছে। এ ছাড়া প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণেও কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের আশা করছি।’
তবে অসহযোগিতার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন উপাচার্য ফরিদুল ইসলাম। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘রাকসুর কোনো কাজেই আমরা অসহযোগিতা করিনি। সাধারণ সভায় তারা যেসব বিষয় উত্থাপন করেছে, সেগুলো ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা কাজগুলো তারা করতে পারে। রাকসুর সভাপতি হিসেবে আমি তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’
আালোচনায় বেশি ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে
ভিপি মোস্তাকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্যাম্পাসের তুলনায় তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বেশি সক্রিয়। চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। অথচ রাকসু নির্বাচনের আগে দলীয় লেজুরবৃত্তির ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে কথা বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার সময় মোস্তাকুরের বিরুদ্ধে ওঠে উসকানির অভিযোগ। সম্প্রতি তিন শিক্ষার্থীকে আম্মারের নেতৃত্বে পিটুনির পর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়ার পর তিনি সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে ফের সমালোচিত হন।
কিন্তু এই দশ মাসে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি বা ছাত্রদের কল্যাণে নেওয়ার কর্মসূচি নিয়ে তারা কথা বলেছেন, এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে।
গোটা সময়ে জিএস আম্মারের নাম বারবার সংবাদ মাধ্যমে এসেছেন তার আচরণ ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। শিক্ষকদের হুমকি, শারীরিকভাবে আক্রমণের একাধিক ঘটনায় অংশ নেওয়ার প্রমাণ আছে তার বিরুদ্ধে। বক্তব্যে বরাবর থাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি। এর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার’ অভিযোগ এনে বেদম পিটুনি দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ক্যাম্পাসে সক্রিয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা এখন আম্মারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
রাকসুতে নিজের ভূমিকার বিষয়ে আম্মার টাইমসকে বলেন, ‘রাকসুতে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের সিদ্ধান্তই স্বাভাবিকভাবে বেশি প্রাধান্য পায়। তবে স্বতন্ত্র ও অন্য প্যানেলের সদস্যদের মতামত অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। আমি সবসময়ই শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই।’


