চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সারা দেশে রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৬ জন নিহত এবং ৫৩৩ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ৯৮ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ০৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৩ জন। এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা মার্চ মাসের তুলনায় কমেছে। গত মার্চ মাসে ১১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৯১২ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় এপ্রিল মাসে অন্তত ৯৮ ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৪৭ জন ও নিহত চারজন। ১২টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১৩ জন, ১৩টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৮ জন। ৩টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৬ জন, ২১টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৪৬ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্তকোন্দলে ১টি ঘটনায় ২০ জন আহত হয়েছেন।
বিভিন্ন দলের মধ্যে ৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩ জন। এ ছাড়া, ২টি ঘটনায় ইউপিডিএফ-এর দুইজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৩টি ঘটনায় কমপক্ষে ৩২ জন আহত এবং ৬ নিহত হযেছেন। যাদের মধ্যে বিএনপির তিনজন, আওয়ামী লীগের দুইজন, জামায়াতের একজন। ৩৭ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ২৬ টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৩টির অধিক মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৩৮৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ২৮২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ১৭৪ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ৮৪ জন এবং জামায়াতের ১৯ জন। এ ছাড়া সারা দেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ১০৮৯জনের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৪৪ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন।
এপ্রিল মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করা বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে ৪০টি হামলার ঘটনায় ৭৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১০ জন সাংবাদিক। ৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪টি মামলায় ৫ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৭টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ৪৯ জনের অধিক ব্যক্তি আহত ও দুইজনকে আটক করা হয়।
এ ছাড়া এ মাসে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্তত ১৪টি ঘটনায় ২৩ জনকে আটক ও ৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় একজন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের সমালোচনায় পাঁচজন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে পাঁচজন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৭টি পৃথক মামলায় ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এ ছাড়া এসব ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৫ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন জন কয়েদি ও তিনজন হাজতি। এর মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের চারজন জন্য সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৮টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ৩টি মন্দির, দুইটি প্রতিমা ও একটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে হামলার ঘটনায় পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নিহত ও ১০ জন অনুসারী আহত হয়েছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, এ্রপ্রিল মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮টি হামলার ঘটনায় একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছে, এদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তা ছাড়া বিএসএফ কর্তৃক আটজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট সীমান্তে ভারতীয় নাগরিক খাসিয়ার গুলিতে দুইজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
অপরদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দুইটি সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তে আরাকান আর্মির পুতে রাখা স্থল মাইনে বাংলাদেশে অবস্থা্নরত ২জন রোহিঙ্গার পায়ে গুরুতর জখম হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে ৮০টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১১৬ জন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৬৪ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এ ছাড়া রাজধানীর বনানীতে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৃথক দুই ঘটনায় দুই গৃহকর্মীকে নির্যাতনে ঘটনা ঘটেছে।
এ মাসে ২৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিল মাসে ৬৮ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ জন নারী ও কন্যা শিশু। ১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৮ জন, আহত হয়েছেন ২ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৪ জন, আহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩৬ জন নারী। এছাড়া, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ১৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৩৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ সময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।


