জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাই ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু দেশের বর্তমান জাতীয় সংসদেই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ধারাবাহিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দলের এমপিদের মাঝে এই বৈষম্য দেখা যাচ্ছে, যা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই টিআর, কাবিখা, কাবিটা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ত্রাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বরাদ্দ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মাঝে দৃশ্যমান বৈষম্য করা হচ্ছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সেতু নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের সিংহভাগই সরকারি দলের এমপিদের এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণমূলক বরাদ্দেও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য সরকারি দলের এমপিদের নির্বাচনী এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ জনকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। বিপরীতে বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় এই সুবিধা পেয়েছেন মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন।
একইভাবে গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে এলজিইডির সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কার কাজের জন্য সরকারি দলের এমপিদের এলাকার ৩০টি প্রতিষ্ঠানে তিন লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠানকে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকার গঠনের পর থেকেই এই বৈষম্যের সূত্রপাত হয় বলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দাবি করছেন। গত রোজার ঈদে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে সরকারি দলের এমপিদের ১০ লাখ টাকা ও ৭০০ পিস শাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হলেও শুরুতে বিরোধীরা তা পাননি। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে শেষ মুহূর্তে বিরোধী দলের এমপিদেরও একই বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ক্ষমতার শুরুতে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচিতে উভয় পক্ষকে সমানভাবে ৫৫ লাখ টাকা, ২০ টন চাল ও ২০ টন গম দেওয়া হলেও গত মে মাসে সরকারি দলের এমপিদের জন্য অতিরিক্ত এক কোটি টাকা এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা পুরোপুরি বঞ্চিত হন। পরবর্তীতে সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে সরব হলে বিরোধীদের জন্য মাত্র ১৩ লাখ টাকা ও ৫ টন চাল বরাদ্দ করা হয়। একে বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ না বলে সমালোচনা থামানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিরোধীরা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য বরাদ্দের ক্ষেত্রেও জুন মাসের মধ্যে সরকারি দলের এমপিরা কোটি টাকার ওপরে বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলের এমপিরা কোনো অর্থ পাননি বলে জানা গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ত্রাণ বিতরণেও একই ধরণের চিত্র দেখা গেছে। যশোর-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য গোলাম রছুল এ প্রসঙ্গে জানান, টিআর ও কাবিখার বৈষম্য তো আছেই, এমনকি যশোরের তিনটি উপজেলার ৪০টি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকার পরও কোনো ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সংসদে তুলে ধরার পরও কোনো লাভ হয়নি, অথচ কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি দলের এমপিরা সহজেই বরাদ্দ পেয়েছেন।
বিরোধী দলের এমপিদের আরও অভিযোগ, তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা খর্ব করতে একটি নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। নির্বাচিত বিরোধী দলীয় এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি কর্মসূচি তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের।
পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সুফল ভোগ করে সরকারে এসেছে, তারাই এখন নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করছে। নির্বাচিত এমপির এলাকায় সংরক্ষিত নারী এমপিদের দিয়ে উন্নয়ন কাজ তদারকি করানো জনগণের রায়কে অবমূল্যায়ন করার শামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উন্নয়ন বৈষম্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে এলজিইডির সেতু নির্মাণ প্রকল্প। সাত হাজার ৯ শ’ ৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পের আওতায় ৪৭টি জেলার ১০৮টি উপজেলায় ২০৪টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০৮টি উপজেলার মধ্যে ১০৫টি উপজেলাই সরকারি দলের এমপিদের এলাকা। বিরোধী দলের এমপিদের মাত্র তিনটি উপজেলা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাও বিশেষ প্রশাসনিক কারণে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পের জন্য। এই মেগা প্রকল্প থেকে সাতক্ষীরা, রংপুর ও কুড়িগ্রামের মতো অনগ্রসর ও অবহেলিত জেলাগুলো পুরোপুরি বাদ পড়েছে।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ জানান, তার পুরো জেলাই এই প্রকল্প থেকে বাদ পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে সরকারি দলের নির্বাচনী এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করেই পুরো প্রকল্প সাজানো হয়েছে, অথচ সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে খোদ পরিকল্পনা কমিশনও প্রশ্ন তুলেছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রকল্পে তা করা হয়নি। এছাড়া এলজিইডি ভবনের লিফটের জন্য ৯ কোটি টাকা ও কম্পিউটার ক্রয়ে ১০ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে কমিশন।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান বাবুল মিঞা জানান, যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রকল্পটি এখনও তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
উন্নয়ন বরাদ্দের এ বৈষম্য প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফটেখারুজ্জামান জানান, অভিযোগ সত্য হলে বুঝতে হবে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হয়নি, কেবল হাতবদল হয়েছে। অতীতেও শাসকেরা উন্নয়নের একচ্ছত্র বয়ান তৈরি করে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, যা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ জুলাই আন্দোলন করেছিল।
তিনি বলেন, নতুন করে উন্নয়ন বৈষম্য তৈরি হলে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতী হবে। কারণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদে সমবণ্টন নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল। বড় প্রকল্পে অপচয় ও অনিয়ম রোধে এর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সঠিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
অবশ্য বৈষম্যের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সরকারি দলের প্রতিনিধিরা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান জানান, সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুষম বণ্টন নীতিতেই বিশ্বাস করে। কোনো প্রকল্প নির্দিষ্ট এলাকার বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী করা হচ্ছে। সেখানে ওই এলাকার এমপি কোন দলের তা বিবেচনা করা হচ্ছে না।
সরকারি দলের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে একটি সুন্দর দেশ উপহার দিতে চান। তিনি বৈষম্যকে কোনো স্থান দিচ্ছেন না। বৈষম্য হচ্ছে এমন কোনো তথ্য তার কাছে পৌঁছালে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন বলে জানান রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।
তবে সরকারের এই আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম মিলন। তিনি জানান, বিএনপির নেতারা মুখে যা বলেন, কাজে তার বিপরীত করছেন। বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন বঞ্চিত রাখা হচ্ছে, যা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
বর্তমান সংসদের সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি—সকল পক্ষই চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্যহীন দেশ গড়ার ডাক দিয়ে আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন উঠছে, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার সেই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি আসলে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে।


