চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে। কর্ণফুলী, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নেমে গেছে এবং বন্যার পানি পুরোপুরি সরে গেছে। তবে পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি। কয়েক দিন আগেও যেসব ঘরের মেঝে কোমরসমান পানিতে ডুবে ছিল, এখন সেখানে জমে আছে কাদা ও দুর্গন্ধ, আর নষ্ট হয়ে গেছে আসবাবপত্র। শুরু হয়েছে পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ এবং সাপের উপদ্রবের মতো নতুন সংকট।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত ১১০ জন এবং সাপের কামড়ে অন্তত ১১৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পানিবাহিত রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পটিয়া উপজেলার মানুষ। পটিয়ায় ২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ফটিকছড়িতে ১৫ জন, আনোয়ারায় ১৩ জন, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীতে ৯ জন করে, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও মীরসরাইয়ে ৭ জন করে, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডে ৬ জন করে, সাতকানিয়ায় ৫ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ জন এবং রাউজানে ১ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, সাপে কাটা রোগীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বোয়ালখালী উপজেলা, যেখানে ২৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপরেই রয়েছে বাঁশখালী, পটিয়া, হাটহাজারী ও রাউজান। বাঁশখালীতে ২০ জন, পটিয়ায় ১৮ জন, হাটহাজারীতে ১০ জন, রাউজানে ৯ জন, সাতকানিয়ায় ৬ জন, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও রাঙ্গুনিয়ায় ৫ জন করে, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়িতে ৩ জন করে, সন্দ্বীপ ও লোহাগাড়ায় ২ জন করে এবং কর্ণফুলী উপজেলায় ১ জন সাপের কামড়ে হাসপাতালে এসেছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, পুরো বিভাগের ১১টি জেলায় মোট সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা ১৩২ জন। আশার কথা: কেউ মারা যাননি।
তবে বন্যায় অন্যান্য কারণে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ জন। পানিতে ডুবে মারা গেছেন ২৪ জন। এছাড়া অন্যান্য কারণে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) শেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে বিভাগীয় তথ্য তৈরির কাজ এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে দূষিত পানি জমে থাকা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থানগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বন্যার এই ভয়াবহতার সাক্ষী সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামের রাজিয়া খাতুন। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন তার পুরো ঘর কাদা আর দুর্গন্ধে ভরা। দীর্ঘদিন নোংরা পানিতে থাকার কারণে তার দুই পায়ে ঘা হয়ে গেছে। এই ক্ষত এতটাই গুরুতর যে তিনি এখন দিনমজুরের কাজেও যেতে পারছেন না। ফলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং তিনি ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
একই উপজেলার মোছাম্মৎ মুন্নির দুশ্চিন্তা এখন ঘর মেরামত নিয়ে নয়, বরং তার শাশুড়ি মালেকা বেগমকে নিয়ে। বন্যার পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তার শাশুড়ির পায়ে সংক্রমণ ও জ্বর দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এমন রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, বন্যার আগে প্রতিদিন পেটের সমস্যা ও চর্মরোগ নিয়ে হাসপাতালে ১০ থেকে ১৫ জন রোগী আসতেন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ জনে দাঁড়িয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরের কয়েক সপ্তাহ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। কারণ এই সময়ে মানুষ দূষিত পানি, আবর্জনা ও জীবাণুর সংস্পর্শে বেশি আসে। বর্তমানে স্ক্যাবিস, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, ডায়রিয়া ও জ্বরের রোগী বাড়ছে।
তিনি পরামর্শ দেন, চর্মরোগ হলেই যেন কেউ ফার্মেসি থেকে নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ কিনে ব্যবহার না করেন। পানি ফুটিয়ে খেতে হবে এবং চিকিৎসার জন্য অবশ্যই সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যেহেতু চর্মরোগ ছোঁয়াচে, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
এদিকে সাপের কামড়ের ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বন্যার কারণে সাপের গর্ত ও ঝোপঝাড় তলিয়ে যাওয়ায় বিষধর ও নির্বিষ—উভয় ধরনের সাপই লোকালয়ে চলে আসছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮০০ ডোজ অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ১১২টি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪৬ হাজার ২০০ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম অবশ্য মনে করেন, শুধু চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প করে এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। দুর্গত এলাকায় যদি দ্রুত নিরাপদ পানি সরবরাহ করা না যায় এবং নষ্ট নলকূপ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সচল করা না হয়, তবে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও অন্যান্য সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের বন্যায় চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮৫ হাজার পরিবারের প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন এবং আহত হয়েছেন ২৪০ জন। পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা ৫৫ জন।
ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ হাজার ২২৮টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৫৯টিই মাটির ঘর। আর পুরো বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ৪৬ হাজার ৫৩৮টি।
এই দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির বাইরে আরেকটি বড় সংকট হলো বন্যার পরের দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে যে দুর্ভোগ শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা আসলে রূপ বদলেছে মাত্র। চট্টগ্রামের বহু মানুষের লড়াই এখন আর বন্যার পানির সঙ্গে নয়, বরং সেই পানির রেখে যাওয়া রোগ, সংক্রমণ আর অদৃশ্য নানা বিপদের বিরুদ্ধে।
তবে নদী ও বাঁধের পরিস্থিতি নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ। তিনি জানান, চট্টগ্রামের সব নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচে রয়েছে। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেছে এবং নদীগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ছোট বাঁধগুলোও ইতিমধ্যে মেরামত করা হয়েছে।


