টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীজুড়ে মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দিনের বেলাতেও অনেক এলাকায় বাসিন্দাদের মশারির নিচে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের আশঙ্কাও তীব্র হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, বসিলা, বেড়িবাঁধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও কড়াইল বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, কয়েল, ধূপ কিংবা মশা মারার স্প্রে ব্যবহার করেও মশার উপদ্রব ঠেকানো যাচ্ছে না।
সম্প্রতি সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজধানীর অনেক এলাকায় মশা নিধনে জোরালো কোনো কার্যক্রম তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বিশেষ মশক নিধন অভিযান চলমান রয়েছে বলে দাবি করেছেন। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিম্নআয়ের মানুষ বসবাসকারী বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশার ওষুধ ছিটানোর কাজটি অত্যন্ত অনিয়মিত। মশক নিধন অভিযান আসলে কোনো কাজে আসছে না।
মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, বেড়িবাঁধ ও বসিলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মশা তাড়াতে বাসিন্দারা দিন-রাত কয়েল ও ধূপ জ্বালিয়ে রাখছেন।
মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার গৃহিণী বীথি আক্তার জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। ব্লিচিং পাউডার ও জীবাণুনাশক দিয়ে ঘরদোর বারবার পরিষ্কার করার পরও ঘরের ভেতর থেকে মশা তাড়ানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘দিন হোক বা রাত, মশার হাত থেকে আমাদের রেহাই নেই।’
বসিলা এলাকার বাসিন্দা শাকিল আহমেদ জানান, ঘরে ছোট বাচ্চা থাকায় তারা মশক নিধন স্প্রে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকছেন। এর বদলে তারা মশারি টাঙিয়ে ও ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়া মশা মেরেই বিনিদ্র রাত পার করছেন। তিনি বলেন, ‘মশারি ভেদ করে কীভাবে যেন মশা ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাই বারবার আমাদের ঘুম ভেঙে যায়।’
মশার এই উপদ্রব ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতেও। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঘিঞ্জি ঘর এবং মশক নিধনের দুর্বল ব্যবস্থার কারণে তারা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। জহুরুল হক হল ও হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থীরা জানান, একসঙ্গে কয়েকটি কয়েল জ্বালিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থী রেদওয়ান হোসেন বলেন, কক্ষগুলোতে এত বেশি শিক্ষার্থী থাকেন যে, অনেকের ঠিকমতো মশারি টাঙানোরও জায়গা থাকে না। তিনি বলেন, ‘ঘুমানোর জন্যই পর্যাপ্ত জায়গা নেই, মশারি টাঙাব কীভাবে? কয়েলেও কাজ হচ্ছে না, সব জায়গায় শুধু মশা আর মশা।’
জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী দেবাশীষ দাস জানান, ১০তলা রবীন্দ্র ভবনের ছাদে গেলেও শিক্ষার্থীরা একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘ভবনের কোথাও শান্তি নেই।’
এদিকে, রাজধানীর ধনী এলাকাগুলোর তুলনায় দরিদ্র এলাকাগুলো সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। কড়াইল বস্তিতে এই বৈষম্য স্পষ্ট। সেখানে সরু গলি এবং ঠাসাঠাসি করে থাকা ঘরবাড়ির চারপাশে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে, যা মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ছোট ছোট ঘরের ভেতর ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়তে থাকায় ভরদুপুরেও পরিবারগুলোকে মশারির নিচে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে।
স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে নিয়ে একটি সরু ঝুপড়ি ঘরে থাকা রিকশাচালক মোহাম্মদ সুমন বলেন, তারা ডেঙ্গু আতঙ্কে ভুগছেন। কিন্তু নিজেদের রক্ষা করার মতো কোনো উপায় তাদের জানা নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কী করব? সারাদিন তো কয়েল জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব না, আর এখানে কাউকে ওষুধ ছিটাতেও দেখি না।’
তার প্রতিবেশী ৬৮ বছর বয়সী রাহেলা বানু অভিযোগ করে বলেন, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা পাশের অভিজাত এলাকা বনানীতে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালালেও কড়াইল বস্তিতে তাদের খুব কমই দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘ওরা বড়লোকদের এলাকায় ওষুধ ছিটায়, কিন্তু এখানে কেউ আসে না।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, ডেঙ্গু মৌসুমের আগেই একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে।
ডিএনসিসির তথ্য কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির খানও বলেন, বছর জুড়েই মশা পর্যবেক্ষণ ও নিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে।
তবে ডিএনসিসির উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক স্বীকার করেন, ভারী বর্ষণের কারণে মশক নিধনের রুটিন কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, করপোরেশন একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে, যা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
অবশ্য বাসিন্দাদের দাবি, তারা এখনো পরিস্থিতির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখতে পাননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম একটি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে কল কেটে দেন।
অন্যদিকে, ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রাসেল রহমান জানান, সরকারি ছুটি থাকার কারণে সাম্প্রতিক মশক নিধন কার্যক্রমের তাৎক্ষণিক তথ্য দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন- ভারী বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি এডিস মশার জন্য অনুকূল প্রজনন পরিবেশ তৈরি করে, যা ডেঙ্গু ছড়ায়। রাস্তাঘাট, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন এবং আবাসিক এলাকায় পানি জমে থাকায় ঢাকাবাসীর আশঙ্কা- সিটি করপোরেশন যদি তাদের তৎপরতা না বাড়ায়, তবে এই মশার উপদ্রব ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
ইতোমধ্যেই যেসব পরিবার দিন-রাত মশারির নিচে কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের কাছে কর্তৃপক্ষের এই সব আশ্বাসের বাণী কোনো স্বস্তি দিচ্ছে না। কড়াইল বস্তির সুমন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা শুনছি অভিযান চলছে। কিন্তু মশা তো আগের মতোই রয়ে গেছে।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন মো. রাইয়ান তাহরিম এবং আফগানী বিন জহর)


