কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই কফি পানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জারিনের দিন। ঘুম থেকে ওঠার পর এটিই তার প্রথম কাজ। এর পরের কাজ ক্লাসের দীর্ঘ লেকচার আর বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে সঙ্গে নেওয়ার জন্য কফি ঢেলে একটি ফ্লাস্ক ভর্তি করা। বিরতির সময় বন্ধুদের সাথে এই কফি ভাগ করে নেন। ফ্লাস্কের কফি শেষ হয়ে গেলে ব্যাগে থাকা মিনি প্যাকেট বা স্যাশে ব্যবহার করে তিনি দ্রুত আরেক কাপ কফি বানিয়ে নেন।
জারিনের এই রুটিন বর্তমানে দেশের এক বিশাল পরিবর্তনের ছবি। বিশেষ করে শহর এলাকার শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীদের কাছে কফি এখন আর কেবল শৌখিন পানীয় নয়, বরং একটি দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কফি এখন মানুষের পড়াশোনা, কাজ এবং সামাজিক মেলামেশার ধরন বদলে দিচ্ছে।
গত কয়েক দশক ধরে চা ছিল এ দেশের প্রধান পানীয়। তবে সেই চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে। দেশে চায়ের ব্যবহার বছরে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর বিপরীতে কফির বাজার অনেক দ্রুত বড় হচ্ছে।
নেসলে বাংলাদেশের লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর দেবব্রত রায় চৌধুরী জানান, গত এক দশকে কফির ব্যবহার বছরে গড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ হারে বেড়েছে।
মানুষের আয় বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, রুচির পরিবর্তন এবং বিশ্বজনীন জীবনযাত্রার প্রভাব এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে। এর পাশাপাশি ক্যাফে চেইনের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। এক সময়ের প্রিমিয়াম বা বিশেষ শ্রেণির এই পানীয় এখন মূলধারায় চলে আসছে।
শুধু রাজধানী ঢাকাতেই এখন প্রিমিয়াম ক্যাফে রয়েছে ১০০টির বেশি। তরুণ প্রজন্মের কাছে কফি এখন উৎপাদনশীলতা এবং অবসরের প্রতীক। কফি শপগুলো এখন ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবীদের অনানুষ্ঠানিক কর্মস্থল ও আড্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তন কেবল উচ্চবিত্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। মফস্বল শহর এমনকি গ্রামের দোকানেও এখন কফির মিনি স্যাশে পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তার ধারের টং দোকানে মাত্র ২০ টাকায় এক কাপ কফি মিলছে। এই সহজলভ্যতা কফির গ্রাহক সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় এই রূপান্তরের বিশাল চিত্র ফুটে ওঠে। নেসলে বাংলাদেশের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের পর থেকে দেশের কফির বাজার পাঁচ থেকে সাত গুণ বড় হয়েছে। এক দশক আগে কফির বার্ষিক ব্যবহার ছিল মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টন, যার বাজার মূল্য ছিল ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। পাঁচ বছরের মধ্যে এই চাহিদা বেড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টনে পৌঁছায় এবং বাজার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে কফির বার্ষিক ব্যবহার ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টন এবং এর বাজার মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মোট বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ব্রুড ও রোস্টেড কফির দখলে, যা নির্দেশ করে মানুষ এখন ইনস্ট্যান্ট কফির বাইরেও উন্নত মানের কফির স্বাদ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এই বাজারে এখনো আধিপত্য বজায় রেখেছে। ইনস্ট্যান্ট কফিতে সবার আগে রয়েছে নেসলে। অন্যদিকে কফি মিক্স এবং ক্রিমারের জন্য ম্যাককফি বেশ পরিচিত। প্রিমিয়াম সেগমেন্টে ‘এসপ্রেসো ৫৭’ এবং ‘রিচ অ্যারোমা’র মতো ফ্লেভার নিয়ে অবস্থান তৈরি করেছে ডেভিডফ। ইতালীয় ব্র্যান্ড লাভাজ্জাও গ্রাউন্ড কফি ও বিন সরবরাহ করছে।
এসব আন্তর্জাতিক নামের পাশাপাশি স্থানীয় ক্যাফে ও রোস্টার্সগুলোও কফি-সংস্কৃতিতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
নর্থ এন্ড কফি রোস্টার্স, আমা কফি, তাবাক কফি, গ্লোরিয়া জিন্স ও ক্রিমসন কাপের মতো ব্র্যান্ডের ক্যাফেগুলো শহর এলাকায় দ্রুত ব্যবসা বিস্তার করছে।
তবে এই দ্রুত প্রসারের মাঝে কিছু সংকটও তৈরি হয়েছে। গত এক দশকে কফির খুচরা দাম অনেকটা বেড়েছে। ২০২১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিতে উচ্চ শুল্ক এই চাপ আরও তীব্র করেছে। বাংলাদেশ কফির জন্য প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এখানে সরাসরি পড়ে।
দামের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক বছরে ১০০ গ্রাম ডেভিডফ কফির দাম ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৯৫০ টাকা হয়েছে। অন্য একটি ভেরিয়েন্টের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৫০ টাকা। নেসলের ৫০ গ্রামের প্যাকের দাম ২০০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা এবং ২০০ গ্রামের নেসলে গোল্ড এখন ১ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০০ গ্রামের ম্যাককফি গোল্ডের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং ম্যাককফি অরিজিনালের দাম ৪৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০০ টাকা হয়েছে। মানভেদে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রতি কেজি কফির দাম ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ করহার কফির দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। কফির ওপর মোট করের পরিমাণ বর্তমানে ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। কাঁচা কফি বিন আমদানিতে শুল্ক কিছুটা কম হলেও প্যাকেটজাত কফিতে পূর্ণ হারে কর দিতে হয়। ২০২২-২৩ বাজেটে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে এই বোঝা আরও বেড়েছে।
দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, এই উচ্চ করহার শেষ পর্যন্ত গত ১০ বছরে প্রায় সাত গুণ বড় হওয়া একটি ক্রমবর্ধমান বাজারের গতি কমিয়ে দিতে। উচ্চ করের কারণে বাজারে অবৈধ আমদানির প্রবণতাও বেড়েছে। এর ফলে বৈধ পথে আমদানি করা পণ্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে।
নেসলের মতো কোম্পানিগুলো যারা দেশে ২৪৫ মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করেছে, তারা চোরাই পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
অন্যদিকে দেশে কফি চাষ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ২০২০-২২ সালে উৎপাদন ৫৫ থেকে ৫৮ টন থাকলেও ২০২৪-২৫ সালে তা ১২২ টনে উন্নীত হয়েছে। মূলত বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কফি চাষ বেশি হচ্ছে। এছাড়া টাঙ্গাইল ও নীলফামারীসহ উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় কফি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যারাবিকা এবং রোবাস্টা—উভয় জাতের কফিই এখানে উৎপাদিত হচ্ছে। বান্দরবানের বগা লেক এলাকার উৎপাদিত কফির মান নিয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছে আন্তর্জাতিক সংস্থা এফএও।
সরকার কফি চাষ বাড়াতে ২১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে কফি উৎপাদন ৪ থেকে ৫ হাজার টনে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্থানীয়ভাবে কফি রোস্টিংয়ের জন্য কাঁচা কফি বিন আমদানিতে নীতি সহায়তা দিলে শুল্ক কমবে। পাশাপাশি এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কফির দাম সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসবে।


