সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিবার তাদের গ্রেপ্তারের খবর জানত। দুজনই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, সে বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানাননি। মৃত্যুদণ্ডের সাজা হওয়ার কথাও জানাননি তারা।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবকের নাম নজরুল ইসলাম। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ওই নারীর নাম সিতি আখতার জানানো হয়েছিল। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, তার বাড়ি কুমিল্লায়। তবে তার প্রকৃত নাম সুইটি আক্তার। বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার নগর ছাওয়ালী চরপাড়া গ্রামে।
নজরুলের বাবা-মা সোমবার জানান, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরব যাওয়ার প্রায় সাত মাস পর ছেলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে নজরুল কারাগার থেকে তাদের ফোন করেন। প্রতি রোববার ফোনে কথা বলতেন তিনি। তবে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানাননি।
সুইটি আক্তারের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় কীভাবে হয়েছিল কিংবা তাদের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল, সে বিষয়ে কিছু জানেন না নজরুলের বাবা-মা।
সুইটির পরিবারও তার গ্রেপ্তারের খবর জানত। তবে গ্রেপ্তারের কারণ কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। সুইটির মা জহুরা বেগম এখনো মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বিশ্বাস করতে পারছেন না। বাবা ফজল মিয়াও আশা করছেন, মেয়ে ফিরে আসবেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দেশে সুইটির বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজের কথা বলে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। এ জন্য নতু মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল।
মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ নামে একটি কোম্পানিতে কাজ করার কথা বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন সুইটি। তবে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় এক বছর পর পরিবার জানতে পারে, সুইটি গ্রেপ্তার হয়েছেন। সুইটি নিজেই ফোন করে আটকের কথা জানিয়েছিলেন।
ফজল মিয়া জানান, সুইটি তাকে বলেছিলেন, মারামারির মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সৌদি আরবে থাকা তার এক বান্ধবী জানিয়েছেন, এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে সুইটি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
গত ১৩ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের দিন পরিবারের সঙ্গে শেষবার যোগাযোগ করেন সুইটি। ফজল মিয়া বলেন, ওই দিন মেয়ে তাকে আড়াই মাসের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিরশ্ছেদের খবর ও সুইটির ছবি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে সেই খবর ফজল মিয়ার কাছেও পৌঁছায়। এতে পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে।
মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাষ সরকার নুপুর বলেন, সুইটির বোনের স্বামী আবদুল বারেক আনসার বাহিনীর সদস্য হিসেবে দুর্গাপূজার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে ডেকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখানো হলে তিনি ওই নারীকে নিজের শ্যালিকা হিসেবে শনাক্ত করেন।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সুইটির শিরশ্ছেদ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তথ্য যাচাই চলছে।’
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলমও জানান, এ বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাননি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়েছেন।
বিদেশে আটক থাকার তথ্য জানলেও নজরুল ও সুইটির পরিবারের কেউ বিষয়টি বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনকে জানাননি। এর কারণ হিসেবে সরকারের কার্যকর কর্মকৌশলের অভাবকে দায়ী করেছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরীফুল হাসান।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ জানে না, বিদেশে একজন বন্দি হলে কোন প্রক্রিয়ায় কাকে জানাবে। এ বিষয়ে আমরা কোনো কার্যকর কৌশল তৈরি করিনি।’
শরীফুল হাসান আরও বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশের কারাগারে আছেন। তাদের পরিবার জানে না। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর পরিবার খবর পায়।’


