ছয় বছরের মেয়ে আফিয়াকে নিয়ে বাসে ঘুমাচ্ছিলেন মেহেরুন্নেছা জেবা। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে তার। এরপরই চোখের সামনে মৃত্যুর বিভীষিকা। দুর্ঘটনার ধাক্কায় সামনের আসনের নিচে চাপা পড়েছিলেন তিনি। চারপাশে পড়ে ছিল চারজনের নিথর দেহ। বাসের ভেতর ছড়িয়ে ছিল ভাঙা কাচ। এর মধ্যেই শোনা যাচ্ছিল কান্নার আওয়াজ। নিজের হাতও ভাঙা বুঝতে পারেন তিনি। এর মধ্যে কয়েকজন এসে শুরু করেন মালামাল লুটপাট।
তখন ভোর ৪টার মতো। বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘আরপি পরিবহনের স্পেশাল নাইস’ বাসটি নাটোরের বড়াইগ্রামে পৌঁছালে ঘটে দুর্ঘটনা।
মঙ্গলবার বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রামের বনপাড়া সরকারপাড়া এলাকায় একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ১২ জন নিহত হন। তাদের বেশির ভাগই দুর্ঘটনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। সেই ঘুম আর ভাঙেনি।
সকালে দুর্ঘটনার পর নাটোরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বড়াইগ্রামের ইউএনও প্রাথমিকভাবে ১৪ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে রাতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘সকালে ১৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও সন্ধ্যা নাগাদ তারা নিশ্চিত হয়েছেন নিহতের সংখ্যা ১২ জন। সবার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
নিহতদের মধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার শরীফুল ইসলাম। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনের আঘাত গুরুতর।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা আরেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাদের অভিযোগ, উদ্ধারের কথা বলে স্থানীয় কয়েকজন তাদের মালামাল লুট করে নিয়ে যান। পরে পুলিশ কিছু মালামাল উদ্ধার করে।
বেলা ১১টার দিকে বনপাড়া হাইওয়ে থানায় বসে কাঁদতে কাঁদতে দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন মেহেরুন্নেছা। বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মামাশ্বশুরের বাড়িতে যাচ্ছিলেন তিনি। দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙার পর একদিকে বেঁচে থাকার স্বস্তি, অন্যদিকে চারপাশে মৃত্যুর দৃশ্য। সব মিলিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মেহেরুন্নেছা বলেন, ‘আমার ছয় বছরের মেয়ে আফিয়া আঘাত না পেলেও কাঁদছিল। ভাঙা কাচ ছড়িয়ে থাকায় বাস থেকে বের হতে পারছিলাম না। এর মধ্যে পায়ের জুতা ও ব্যাগ হারিয়ে যায়। হাত টান করে পাশে পড়ে থাকা এক লাশের স্যান্ডেল সংগ্রহ করি। কিন্তু বের হতে পারছিলাম না। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন আমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন।’
বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলমগীর হোসেন জানান, মেহেরুন্নেছার হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ উদ্ধার করে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি বরিশালের উদ্দেশে ফিরে গেছেন।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে একাধিক বক্তব্য পাওয়া গেছে। কারও দাবি, একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটি বিপরীত দিক থেকে আসা বালুভর্তি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়। আবার কেউ বলছেন, বাসচালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
যাত্রী সোহেল রানা বলেন, ‘ভোরের দিকে চালক গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে বাসটি বাম দিক থেকে ডান দিকে চলে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।’
নিহতদের মধ্যে বাস ও ট্রাকের চালকও রয়েছেন। বাসটিতে আসনে বসা যাত্রীদের পাশাপাশি অনেক যাত্রী দাঁড়িয়েও ছিলেন। বাসচালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও আবদুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার এবং পুলিশ সুপার শরীফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’
দুর্ঘটনা কমাতে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দুর্ঘটনার পর হতাহতদের মালামাল লুট
বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ কয়েকজন জানান, জ্ঞান ফেরার পর তারা দেখেন, কয়েকজন তাদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও পকেটে থাকা টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসের ভেতর আটকে থাকায় তারা প্রতিবাদ করতে পারেননি। তবে কয়েকজন তাদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেন।
সোহেল রানাও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার ধাক্কায় জ্ঞান হারিয়েছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি, কয়েকজন আমাদের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও পকেটের টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসের ভেতর আটকে থাকায় কিছু বলতে পারছিলাম না। তবে কয়েকজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেছেন।’
নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, ‘সব জায়গায় কিছু মানুষ আছেন, যারা বিপদের সময়ও অন্যদের সহযোগিতা করেন না।’
দুর্ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো আহতদের ও নিহতদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিহতদের পরিচয়
নিহত ১২ জনের মধ্যে রাজশাহীর বাসিন্দা দুজন। তারা হলেন গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা এবং বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক।
পটুয়াখালীর বাসিন্দা দুজন। তারা হলেন মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্বসুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম এবং তার আট বছর বয়সী মেয়ে তাছফিয়া খাতুন।
সবচেয়ে বেশি পাঁচজন শরীয়তপুরের বাসিন্দা। তারা হলেন জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল, ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার, জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা, আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির এবং পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ।
অন্য নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ও ট্রাকচালক আবু কালাম, নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার।


