হত্যাকাণ্ডের ভিডিও রয়েছে। হামলাকারী ও উসকানিদাতাদের পরিচয়ও জানা গেছে। এরপরও কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর শামীম জাহাঙ্গীর ওরফে আব্দুর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত ছয় মাসেও শেষ হয়নি। এর মধ্যে মামলার সব আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম দক্ষিণ ফিলিপনগরে শামীম জাহাঙ্গীরের বাড়িতে অবস্থিত দরবার শরিফে হামলা হয়। ফেসবুকে উসকানি দিয়ে লোক জড়ো করে এ হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। হামলায় পীর শামীম নিহত হন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।
হামলার দুই দিন পর শামীমের বড় ভাই ফজলুর রহমান দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। এতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য মুহাম্মদ খাজা আহমেদকে প্রধান আসামি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ, জামায়াত-সমর্থক রাজিব মিস্ত্রি ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক সিহাব উদ্দিন সাফি। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে দরবার শরিফে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগ আনা হয়।
একে একে জামিনে মুক্ত আসামিরা
মামলার প্রধান আসামি মুহাম্মদ খাজা আহমেদ ও দ্বিতীয় আসামি আসাদুজ্জামান আসাদ গত ১৯ মে হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। জামিনের মেয়াদ শেষে ২০২৬ সালের ৩০ জুন তারা কুষ্টিয়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। বিচারক এনায়েতুল কবির তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠান। ৫২ দিন কারাবাসের পর খাজা আহমেদ জামিনে মুক্তি পান।
৩০ এপ্রিল রাতে মামলার তৃতীয় আসামি রাজিব মিস্ত্রিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, বর্তমানে এসআরবি।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের দশম শ্রেণির এক স্কুলছাত্র, দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের বিপ্লব হোসেন ও আলিফ ইসলামকেও গ্রেপ্তার করা হয়। বিপ্লব ও আলিফকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তারাও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
তদন্তের ধীরগতিতে হতাশ বাদী
হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশ মামলার বাদী ফজলুর রহমান। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘মামলার এমন ধীরগতি ও স্থবিরতায় আমরা হতাশ। আমরা চাই, পুলিশ প্রশাসন ও রাষ্ট্রপক্ষ সঠিকভাবে মামলাটির তদন্ত পরিচালনা করুক এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিক।’
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহসিন চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।’
তবে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান আদালতে কবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি।
যেভাবে আলোচনায় আসেন পীর শামীম
পীর শামীম আশির দশকে কুষ্টিয়ায় কলেজজীবন শেষ করেন। পরে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম পাস করে কেরানীগঞ্জের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন।
পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন। সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন তিনি। এ সময় পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে ফিরে পৈতৃক জমিতে আস্তানা গড়ে তোলেন।
২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর আলোচনায় আসেন শামীম। একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মুক্তি পেয়ে ফিলিপনগরের দরবারে ফিরে যান তিনি। সময়ের সঙ্গে তার অনুসারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে।


