সাত বছরের নিস্তব্ধতা: কবে খুলবে শাহবাগ শিশু পার্ক?

সাত বছরের নিস্তব্ধতা: কবে খুলবে শাহবাগ শিশু পার্ক?
ফাইল ফটো
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত শিশু পার্কটিতে দীর্ঘ সাত বছর ধরে শিশুদের কোনো কোলাহল নেই। এক সময়ের আনন্দমুখর এই পার্কটি এখন ধুলোবালি আর অযত্নে পড়ে আছে। এখন ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পার্কের সেই চিরচেনা রঙিন রাইড। পার্কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসমাপ্ত স্থাপনা।

এই দীর্ঘ বন্ধের মাঝেও অনেক পরিবার বুকভরা আশা নিয়ে এখানে ঘুরতে আসে। গত ঈদে জসিম মিয়া তার সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে এই পার্কে এসেছিলেন। পার্কের গেট বন্ধ দেখে তাকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। জসিম মিয়া এই প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন রাখেন, পার্কটি এত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তারা শিশুদের নিয়ে কোথায় যাবেন। তার মেয়ের মন খারাপের দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বেদনার।

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পার্কটির নাম নিয়ে নানা সময়ে পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে এর নাম ছিল ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। ২০২১ সালে নাম বদলে রাখা হয় ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক’। তবে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক সভায় পুনরায় এর নাম ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ করা হয়।

১৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই পার্কটি ১৯৮৩ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের হাতে আসে। বর্তমানে জমির মালিকানা গণপূর্ত বিভাগের হলেও পার্ক পরিচালনা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

অবশ্য সাধারণ মানুষের কাছে এটি এখনো শাহবাগ শিশু পার্ক নামেই পরিচিত। এক সময় এটি ছিল রাজধানীসহ সারাদেশের শিশুদের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র। সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক রাইড এবং খোলামেলা পরিবেশের কারণে এখানে সবসময় ভিড় লেগে থাকত।

২০১৮ সালে পার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তখন পুরোনো রাইডগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। ২০২৩ সালে একনেক সভায় ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এই বাজেটের বড় অংশ খরচ করা হবে ইউরোপীয় মানের ১৫টি নতুন রাইড কেনার জন্য।

আরও পড়ুন

সংস্কার, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে পার্কটি বন্ধের ঘোষণা দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। শুরুতে এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও অর্থায়ন জটিলতায় কাজ শুরু হতেই দেরি হয়। পরবর্তীতে কাজের সময়সীমা বাড়ানো হয় কয়েক দফা। নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

পার্কের বর্তমান অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থী কামরুল হাসান। তিনি সপরিবারে দূর থেকে এসে পার্কটি বন্ধ পান। কামরুল হাসান বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের বিনোদনের জায়গা এমনিতেই কম। দীর্ঘ বছর ধরে পার্কটি বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

কর্মকর্তারা জানান, নকশা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ যথাসময়ে শেষ হয়নি। তবে এখন রাইড কেনা এবং অন্যান্য কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। তাদের আশা, ২০২৭ সালের জুন মাসে পার্কটি পুনরায় চালু হতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিসুর রহমান জানান, প্রকল্পের প্রায় ৩৭ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পার্কের ভেতরে এখন বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পার্কের বড় একটি অংশে বিশাল ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং নির্মাণ করা হয়েছে। আগের রাইড বা টিলার এখন আর কোনো চিহ্ন নেই। পার্কের মাঝখানের বড় গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। পার্কের গেটে এখন কেবল অস্থায়ী কিছু দোকান গড়ে উঠেছে।

নগদ পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান পার্কটির এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, পার্কের নিচে কংক্রিটের পার্কিং এবং ওপরে রাইড বসানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মানুষ মাটির ছোঁয়া আর সবুজ ঘাস দেখতে চায়। কংক্রিটের কাঠামো শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, পার্কটি বন্ধ থাকায় রাজধানীর শিশুদের বিনোদনের বড় ক্ষতি হয়েছে।

১৯৭৯ সালের আগে রমনা-সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশ ছিল এই এলাকা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এখানে ছিল রেসকোর্স ময়দান। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল প্রথম সরকারি শিশু পার্ক। বর্তমানে শাহবাগ শিশু পার্ক বন্ধ থাকায় এর আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।

যে পার্কটি ছিল শিশুদের হাসাহাসিতে মুখর, সেখানে এখন কেবল নীরবতা খেলা করে। শহরের শিশুদের জন্য এটি এখন আর কোনো ঘোরার জায়গা নয়, বরং একটি না দেখা গল্পের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad