তৈরি পোশাক, ওষুধ ও সিরামিক শিল্পসহ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গাজীপুরে দিন দিন মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। একের পর এক হত্যা, মহাসড়কে ডাকাতি, শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মহাসড়ক থেকে অলিগলি কোথাও স্বস্তি নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসা, পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘাত ঘটছে, অথচ ঝামেলা এড়াতে অনেকেই থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করছেন না।
মাস দুয়েক আগে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন পশ্চিম জয়দেবপুরের মেডিকেল শিক্ষার্থী মাইশা ফৌজিয়া সৃজনী। কানের স্বর্ণের দুল হারিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত মাইশা বলেন, “অনেক সড়ক এখন ছিনতাইকারীদের কারণে অনিরাপদ মনে হয়। পুলিশের পাশাপাশি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারে।”
এদিকে চাঁদা না দেওয়ায় হামলার শিকার হয়েছেন কালিয়াকৈরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “স্থানীয় কয়েকজন যুবক আমার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে আমি রক্তাক্ত জখম হই।”
সাম্প্রতিক কালের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধের ঘটনা ঘটে চলতি বছরের গত ৯ মে। এদিন কাপাসিয়ার রাউৎকোনায় একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরদিন কালিয়াকৈরের বাগচালায় গরুচোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তিনজনকে। গাছায় অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যাসহ সড়ক-মহাসড়কে প্রায়ই লাশ উদ্ধার হচ্ছে। এছাড়া গত ২৯ এপ্রিল টঙ্গীর কেরানীরটেক এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলায় চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হন।
গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির। তিনি বলেন, “অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আলোচিত হত্যাগুলোর বিচার দ্রুত না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।”
টঙ্গীর বাসিন্দা রিয়াজ হাসান মনে করেন অপরাধের মূল উৎস মাদক। তার মতে, “মাদক এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের কারণেই হত্যা, ছিনতাই ও নানা ধরনের অপরাধ বাড়ছে। সন্ধ্যার পরও মানুষ নিরাপদ বোধ করে না।”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও কথা বলেন স্থানীয় শিক্ষক মিয়াজ উদ্দিন। তিনি বলেন, “বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চাঁদাবাজির প্রবণতা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে আরও কার্যকর ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে মানুষ স্বস্তিতে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে।”
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে ব্যবসায়ী জায়েদুল হামিদ বলেন, “গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মানুষ এখনও পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছে না।”
এছাড়া সন্ধ্যার পর মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় অবাধ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ চান গাজীপুর জজকোর্টের আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরে ২০২১ সালে ৫৫টি, ২০২২ সালে ৫৭টি, ২০২৩ সালে ৯৪টি, ২০২৪ সালে ৯৬টি, ২০২৫ সালে ৮১টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ২৭টি হত্যা মামলা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) কার্যালয়ের তথ্য মতে, উপজেলার পাঁচ থানায় ২০২১ সালে ২৭টি, ২০২২ সালে ৩৪টি, ২০২৩ সালে ৪৩টি, ২০২৪ সালে ৩৭টি, ২০২৫ সালে ৩২টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৮টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়।
এছাড়া শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ২০২১ সালে ৬৮৫টি, ২০২২ সালে ৬৩৪টি, ২০২৩ সালে ৬৬৫টি, ২০২৪ সালে ৭৮০টি, ২০২৫ সালে ৮৩০টি এবং চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত ৫৩৫টি লাশ ময়নাতদন্তের জন্য এসেছে, যার মধ্যে হত্যা, আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা অস্বাভাবিক মৃত্যু রয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গাজীপুরে অপরাধ আগের চেয়ে কমেছে। অপরাধীদের কৌশল ব্যাখ্যা করে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অপরাধীরা গাজীপুরে এসে আত্মগোপন করে মাদক, ছিনতাই ও ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং অপরাধ ঘটিয়ে চলেও যায়।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, “আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে মহানগর এলাকায় হত্যাকাণ্ড কমেছে। পুলিশ প্রতিটি হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। শুধু হত্যা নয়, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।”
জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন জানান, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।”
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার আশ্বস্ত করে বলেন, “নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”


