বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে বিএনপি সরকার। পাঁচ বছর আগে চীনা কোম্পানি চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিএমইসি) সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের করা সমঝোতার আলোকে এবার চূড়ান্ত চুক্তি হতে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগামী ২ সেপ্টেম্বর চীনের বেইজিংয়ে ত্রিপক্ষীয় এই চুক্তি হতে যাচ্ছে, যাতে আরেক অংশীদার থাকবে ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আবদুল মঈন খানের সঙ্গে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন।
চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ২০২৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এই বিদ্যুতের দাম পড়বে ইউনিট প্রতি ২১ দশমিক ৭০ সেন্ট বা প্রায় ২৫ টাকা।
প্রতিমন্ত্রী বলছেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে এই দর বেশি মনে হলেও এতে বাংলাদেশের বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক লাভ রয়েছে।’
বর্জ্য থেকে বিদ্যুতের এই উদ্যোগ বাংলাদেশ প্রথম নেয় ২০০০ সালে। সে সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কথা বলেছিল। তবে ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কাজ আর আগায়নি।
২০১১ ও ২০১২ সালেও আওয়ামী লীগ সরকার বর্জ্য থেকে ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল তৈরিতে কাজ শুরু করে। ২০১৩ সালে ইতালির ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ফাইনান্সের (এসআরএল) সঙ্গে ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়। সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৭৫ পয়সা দামে কেনার কথা জানায়। পরে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়।
২০১৫ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে পরিকল্পনার নির্দেশ দেন। চার বছর পর স্থানীয় সরকার বিভাগ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে।
পরের বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭টি প্রস্তাব জমা পড়ে; পরে চারটি প্রস্তাব বাছাই করা হয়। ওই বছরেই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট আমিনবাজার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন করে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার ও চীনা কোম্পানি সিএমইসির মধ্যে আমিনবাজারে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি হয়। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সিএমইসির মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২৫ বছর প্রতি ইউনিট ২১ দশমকি ৭৮ সেন্ট দরে বিদ্যুৎ কেনার কথা হয়। তখনকার ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী দর দাঁড়াত ১৮ টাকার ২৯ পয়সা।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। তবে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।
এই প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে বেশি হলেও পরিবেশগত বিবেচনায় এটি লাভজনক বলেই মনে করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী।
লাভের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকার ময়লার বোঝা ধ্বংস হবে, জৈব সার উৎপাদিত হবে এবং ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশন মাসিক ভাড়া পাবে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধার মাধ্যমে এই খরচ উঠে আসবে।’
একই আদলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলেও জমে থাকা বর্জ্য থেকে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানিকে দ্রুত কাজ শুরু করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতেও আলোচনার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, গ্রামীণ হাট-বাজার, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের বিল্ডিংয়ের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বিত হবে–অর্থাৎ দিনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে এবং রাতে গ্রিডেরে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে।
চীনা ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা এতে প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহ করতে রাজি হয়েছেন।
ঢাকা ওয়াসার দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের বাকি ৭০ শতাংশ কাজ দ্রুত চালুর বিষয়ে চীন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। বর্তমানে প্রকল্পটির ৩০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকা থেকে পয়ঃসংযোগ এখনো শতভাগ যুক্ত করা যায়নি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সংযোগের জন্য সরকারি অর্থায়নে ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে চীনকে প্রস্তাব দেওয়ার পর তারা সম্মতি প্রকাশ করেছে।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, চীন দ্রুত সময়ের মধ্যে মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কাজ শুরু করবে। একই সঙ্গে মংলা সঙ্গে চট্টগ্রাম পোর্টের একটি সরাসরি লজিস্টিক লিংকেজ গড়ে তোলার কাজ করবে দেশটি।
বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির অংশ হিসেবে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর যে জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানেও চীন সহায়তা করবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
চীনা বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে এসে চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণ দেবেন। এর জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কোনো অর্থ দিতে হবে না।
বস্তিবাসীর জন্য বিনা ভাড়ায় ফ্ল্যাট প্রকল্প
গুলশানের কড়াইল, সাততলা ও মিরপুরে ভাসানটেক বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নেও চীন রাজি হয়েছে বলে জানান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী।
বস্তি তিনটিতে ২০ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে থাকবে ছোট ছোট ইউনিটের ফ্ল্যাট।
‘এই ফ্ল্যাটগুলোতে বস্তিবাসীরা বিনা ভাড়ায় বসবাস করতে পারবেন। আমরা তাদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করব না, আবার মাসিক ভাড়ায়ও দেব না। তবে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতার ইউটিলিটি চার্জ বাসিন্দাদের নিজেদের বহন করতে হবে। কারণ এই পরিচালন ব্যয় সরকার বহন করবে না’, বলেন প্রতিমন্ত্রী।
বিকল্প পথ খোলা রাখতে আবাসন প্রস্তাবটি বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকেও পাঠানো হয়েছে।


