সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার খবরকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এ ধরনের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
শনিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গভর্নর বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারকে দেওয়ার তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য এবং এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এ ধরনের সংবাদ দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস’ নামে একটি স্বল্পমেয়াদি হিসাব রয়েছে, যার মাধ্যমে সাময়িক নগদ ঘাটতি মেটানো হয়। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত। এই হিসাবের সীমা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সমন্বয় করা হয়।
গভর্নর জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই হিসাবের স্থিতি ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা বর্তমানে কমে ১১ হাজার ১০৩ কোটিতে নেমে এসেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি নতুন করে টাকা ছাপানোর বিষয় নয়, বরং সরকারের আয়-ব্যয়ের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার অংশ।
এ সময় তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দেশের ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা সরকার ও বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
এছাড়া তিনি জানান, একীভূত করা ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) একীভূত করতে সময় লাগবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুনঃমূলধনীকরণ, বেসরকারীকরণ বা একীভূতকরণের মতো বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্টার্টআপ খাতের উন্নয়নে ‘স্টার্ট-আপ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট’ নামে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার একটি তহবিল চালুর কথাও জানান গভর্নর। পাশাপাশি ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ৩০ জুনের পর বিকল্প কোনো কিউআর কোডের মেয়াদ বাড়ানো হবে না।
গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণখেলাপির আওতায় থাকলেও এর একটি বড় অংশের বিপরীতে কোনো দৃশ্যমান সম্পদ বা যথাযথ কাগজপত্র নেই। ফলে এসব ঋণকে প্রচলিত অর্থে খেলাপি বলা কঠিন, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ বা চুরি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতির কারণ বেনামি লেনদেন ও গোপন সম্পদ শনাক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপিঋণের বিপরীতে সাধারণত সম্পদ থাকে এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে তা আংশিক উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদায়যোগ্য প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, মার্চেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটা হাইপাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। অর্থাৎ এটার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।


