প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি ওয়াশিংটনের আস্থা এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়ে ঢাকা সফর শেষ করলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষদূত সার্জিও গর।
রাষ্ট্রদূত গর জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন বলেছেন, বাংলাদেশে ব্যবসার নতুন সুযোগ খুঁজতে এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক করতে চলতি মাসের শেষের দিকে ২৫টি শীর্ষ মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫ জন প্রতিনিধির একটি বাণিজ্য দল ঢাকা সফরে আসছে।
শনিবার শেষ হওয়া এই তিন দিনের সফর থেকে স্পষ্ট, ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলার যে কূটনৈতিক কৌশল নিয়েছে, তা অন্তত এই মুহূর্তে সফল হয়েছে। উল্লেখ্য, মাত্র এক মাস আগেই তারেক রহমান বেইজিং সফর করেন, যেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দেন।
বেইজিংয়ের মতো ওয়াশিংটনও বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের প্রতি নিজেদের ভরসার কথা জানাতে চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সার্জিও গর বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইতিবাচক বার্তা এবং ব্যবসায়িক দলের সফর দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যেতে প্রস্তুত।
এক সাবেক কূটনীতিকের মতে, কূটনীতির একটি বড় কাজই হলো পারস্পরিক আলোচনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দুই দেশের বন্ধুত্বকে পোক্ত করা।
তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতরের আলোচনায় যাই হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা যে একটা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে—এ নিয়ে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট বলেই মনে হচ্ছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমান এবং সার্জিও গর এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বার বৈঠকে বসেছিলেন–প্রথমটি ম্যানিলায় একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকে এবং পরেরটি ঢাকায়। এর ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক নানা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়।
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় মূল নজর
বৃহস্পতিবার গরের সঙ্গে বৈঠকের পর খলিলুর রহমান জানান, তাদের মূল আলোচনা ছিল বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসন এবং রোহিঙ্গা সংকট কেন্দ্রিক। আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয়গুলো উঠে আসবে বলে ভাবা হলেও, আলোচনা মূলত দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমরা দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক, বিশেষ করে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অভিবাসন নিয়ে কথা বলেছি। সময়ের অভাবে হয়তো একদম গভীরে গিয়ে কথা বলা যায়নি, তবে সম্পর্ককে কোন দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে—তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’
বৈঠক শেষে মার্কিন দূত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশকে ভ্রমণ ঝুঁকির ‘লেভেল ৩’ থেকে কমিয়ে ‘লেভেল ২’-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার জন্য আগের কড়াকড়ি বহাল রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গরের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট, মার্কিন বিনিয়োগ, কৃষিপণ্য গুদামজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে।
মার্কিন দূত রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন এবং ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান।
বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে চর্চার খবর মিলবে ভাবা হলেও, উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় এমন দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানো।
দুই পরাশক্তির মধ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য
বিশ্বের দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার লড়াই তুঙ্গে থাকলেও, বাংলাদেশ সবসময়ই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলার নীতি মেনে চলেছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরপর উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে না পড়ে নিজের মতো নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগোচ্ছে।
এক সাবেক কূটনীতিক জানান, গরের সফর থেকে দেওয়া প্রকাশ্য বার্তাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক কেমন–সে বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন এখন সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও আশ্বস্ত।
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হবে মার্কিন দূতের এই সফল সফরের বিষয়টি একইভাবে স্বচ্ছতার সাথে বেইজিংয়ের কাছে তুলে ধরা।’
অন্য আরেকজন সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবসার কথা বলা হলেও এই সফরের একটি বড় কৌশলগত দিক রয়েছে।
তার মতে, ‘শুধু সাধারণ রুটিন বিষয় নিয়ে কথা বলতে কোনো দেশের বিশেষদূত উড়ে আসেন না। খুব স্বাভাবিকভাবেই, যেসব বিষয় প্রকাশ্যে আনা হয়নি–এমন কিছু বড় কৌশলগত হিসাব-নিকাশও এই আলোচনার টেবিলে নিশ্চয়ই ছিল।’
দিনশেষে এই সফরটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যেকোনো বড় শক্তির সঙ্গেই বন্ধুত্ব বাড়াতে প্রস্তুত, তবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেই তা করা হবে।


