বাংলা গানের অনন্য এক বটবৃক্ষ সৈয়দ আব্দুল হাদীর জন্মদিন ১ জুলাই। ১৯৪০ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মানুষটি ৮৬ বছরে পা রাখলেন। প্রায় ছয় দশক ধরে যার কণ্ঠ বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে চলেছে, সেই জীবন্ত কিংবদন্তিকে সম্প্রতি বিশেষ সম্মাননা জানানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
সৈয়দ আব্দুল হাদীর শৈশব কেটেছে একাধিক জনপদে ঘুরে ঘুরে। জন্ম আগরতলায়, বেড়ে ওঠা সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কলকাতায়, আর কলেজজীবন রংপুর ও ঢাকায়। বাবা সৈয়দ আবদুল হাই ছিলেন ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) কর্মকর্তা, গানও গাইতেন নিজে, আর গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনাটা ছিল তার প্রিয় শখ। বাবার সেই শখের সূত্র ধরেই কৈশোরে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয় হাদীর মনে। ছোটবেলা থেকে গাইতে গাইতেই শিখেছেন গান—কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম ছাড়াই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাড়ির কাছেই থাকতেন সংগীত পরিবার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্বজনেরা। বয়সে কিছুটা বড় হলেও রাজা হোসেন খানের সঙ্গে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। তার সেতার রেওয়াজ শুনেই কিশোর হাদীর মনে জাগে গান শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। রাজা হোসেন খান তাকে পাঠিয়ে দেন ওস্তাদ ইসরাইলের কাছে—সেখান থেকেই শুরু তার নিয়মিত সংগীতচর্চার।
১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন সৈয়দ আব্দুল হাদী। এখান থেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই সুবল দাস, পি সি গোমেজ, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফের মতো গুণী সংগীতজ্ঞদের সান্নিধ্য পান এবং তাদের উৎসাহে গানের জগতে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করেন। ছাত্রজীবনেই, ১৯৬০ সালে, চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন—তখন তার বয়স মাত্র কুড়ি। প্রথম পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছিলেন ১০ টাকা, যা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কাটলেট খাওয়া আর সিনেমা দেখার পরও কিছু টাকা পকেটে থেকে গিয়েছিল বলে নিজেই স্মৃতিচারণা করেছেন শিল্পী।
১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো একক কণ্ঠে বাংলা চলচ্চিত্রে গান করেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। ছবির নাম ছিল ‘ডাকবাবু’, গীতিকার মো. মনিরুজ্জামান আর সুরকার আলী হোসেন। এই একটি গান দিয়েই শুরু হয় চলচ্চিত্রের গানে তার দীর্ঘ ও সফল যাত্রা। একই বছর বেতারে গাওয়া তার প্রথম জনপ্রিয় গান ‘কিছু বলো, এই নির্জন প্রহরের কণাগুলো হৃদয়মাধুরী দিয়ে ভরে তোলো’ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। আবদুল আহাদের সুরে গাওয়া এই গানটি আজও রোমান্টিক বাংলা গানের অন্যতম নিদর্শন হয়ে আছে।
কেবল গায়ক হিসেবেই নন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের একেবারে সূচনালগ্নে প্রথম চারজন প্রযোজকের একজন ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। বেতার আর টেলিভিশনে গাওয়া তার প্রথম দুটি গানই ছিল কবি শামসুর রাহমানের লেখা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছুকাল শিক্ষকতা করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রের গানে সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় স্বর। পরিচালক সালাউদ্দিন জাকির ‘ঘুড্ডি’ ছবিতে লাকী আখন্দের সুরে গাওয়া ‘সখি চলনা, সখি চলনা জলসাঘরে এবার যাই’ গানটি আজও শ্রোতামহলে সমান জনপ্রিয়। পাঁচবার শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি—‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ (১৯৭৮), ‘সুন্দরী’ (১৯৭৯), ‘কসাই’ (১৯৮০), ‘গরীবের বউ’ (১৯৯০) ও ‘ক্ষমা’ (১৯৯২) ছবির গানের জন্য।
সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে গাওয়া কালজয়ী দেশের গান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত করে আসছে। শুধু আধুনিক আর চলচ্চিত্রের গানেই থেমে থাকেননি তিনি, রবীন্দ্রসংগীতেও রেখেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর। বিশ্বকবির সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয় তার প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের একক অ্যালবাম ‘যখন ভাঙল মিলনমেলা’।
সংগীতে অবদানের জন্য ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে ভূষিত করে একুশে পদকে, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। পাঁচবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন আরও অসংখ্য সম্মাননা। সাম্প্রতিক সংযোজন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ সম্মাননা।
সংগীতের বাইরেও ছিল সৈয়দ আব্দুল হাদীর ভিন্নধর্মী এক কর্মজীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি পাড়ি জমান লন্ডনে, যুক্ত হন ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান পদ থেকেই অবসর নেন।
সোসৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠের ব্যাপ্তি, তন্ময়তা আর গম্ভীর সুরাবেগ সাধারণ শ্রোতা থেকে গুণীজন—সবার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। ৮৬ বছর বয়সেও তিনি বাংলা সংগীতের এক জীবন্ত ইতিহাস, যার ছায়ায় বেড়ে উঠেছে বাংলা গানের বহু প্রজন্ম।


