রাজধানীর ফুটপাত ও প্রধান সড়কে আর হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য অঞ্চলভিত্তিক নিবন্ধন, জায়গার ধারণক্ষমতা অনুযায়ী হকারের সংখ্যা নির্ধারণ এবং শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি অফিস সময়ের পর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নৈশ মার্কেট চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার নগর ভবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালামের সভাপতিত্বে ‘হকার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ এসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সভায় হকারদের প্রতিনিধিরাও তাদের বিভিন্ন দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।
সভায় প্রশাসক বলেন, রাজধানীর সব হকারকে একই জায়গায় বসানোর সুযোগ নেই। একদিকে হকারদের জীবিকার সুযোগ রাখতে হবে, অন্যদিকে নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল ও সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান সড়কে বসার সুযোগ নেই
প্রধান সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না বলে সভায় স্পষ্ট করেন প্রশাসক। তবে তুলনামূলক কম ব্যবহৃত কিছু সড়কের নির্দিষ্ট অংশ হকারদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
গুলিস্তান থেকে জিরো পয়েন্ট হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত সড়কে যান চলাচলে হকারদের কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় বসতে পারবেন না আপনারা। রাস্তা প্রধানত চলাচলের জন্য।’
তিনি বলেন, হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে, তবে তা নির্ধারিত জায়গা ও নিয়মের মধ্যে হতে হবে। যত্রতত্র বসার সুযোগ থাকবে না।
শুক্রবার-শনিবার হলিডে মার্কেট
প্রতিদিন হকারদের বসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া সম্ভব না হলেও তাদের জন্য শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি অফিস সময় শেষে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নৈশ মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসক বলেন, ‘কিছু রাস্তায় আমরা প্রতিদিনের জন্য দেব, সেটা হলো অফিস সময়ের পরে। রাত্রিকালীন—ওটা হলো নৈশ মার্কেট।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, দিনের বেলায় ব্যস্ত থাকলেও রাতে ফাঁকা থাকে—এমন কিছু এলাকা নৈশ মার্কেটের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে মতিঝিলও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নৈশ মার্কেট চালু করতে চাই। রাতের অর্থনীতি—রাতে চলবে। অফিস শেষ হওয়ার পরপরই আমরা এটা শুরু করে দেব।’
দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য
হকারদের নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনাকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান ডিএসসিসি প্রশাসক।
তিনি বলেন, ‘সবাইকেই আমরা অ্যাকোমোডেট করতে চাই। কিন্তু সবাই যদি এক জায়গায়ই চান—গুলিস্তানের সব হকারকে তো আমরা এখানে জায়গা দিতে পারব না।’তিনি বলেন, ব্যবসা নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালনা করাই কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা।
লাইসেন্স দেখে বসাবে পুলিশ
হকারদের নিবন্ধনের পর লাইসেন্স ও নম্বর দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। লাইসেন্সে হকারের ব্যবসার ধরন, নির্ধারিত জোন, অবস্থান, স্টলের আয়তন ও ব্যবসার সময় উল্লেখ থাকবে। বারকোড ও কিউআর কোডের মাধ্যমে পুলিশ এসব লাইসেন্স যাচাই করতে পারবে।
প্রশাসক বলেন, ‘লাইসেন্স দেখে পুলিশ বসতে দেবে। এতে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে।’
নিবন্ধিত হকার পাবেন নাগরিক সুবিধা
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনায় অঞ্চল, থানা ও জোনভিত্তিকভাবে হকারদের তালিকা তৈরি করে নিবন্ধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় যতটুকু জায়গা ও ধারণক্ষমতা থাকবে, সেই অনুপাতে হকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। বৈধ নিবন্ধন ও নম্বর পাওয়া হকারদেরই নির্ধারিত জায়গায় ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হবে।
নিবন্ধনের পর স্থান ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য হকারদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি নেওয়া হবে। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সিটি করপোরেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।
প্রশাসক বলেন, ‘আপনারা সিটি করপোরেশনকে পয়সা দেবেন, সুতরাং অবশ্যই সিটি করপোরেশন কিছু সুযোগ-সুবিধা আপনাদের দেবে।’
এ সময় সেগুনবাগিচাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা, লেন ও গলিতে হকার বসার বিষয়টি তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দোকানিরা তাদের দোকানের সামনের জায়গা হকারদের কাছে ভাড়া দেন। এতে হকারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।
হকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কোনো মার্কেটের দোকানদারদের কাছ থেকে দোকানের ভাড়া নেবেন না। কোনো এলাকার মাস্তান—সে যে দলেরই হোক, কোনো মাস্তানের কাছ থেকে ভিটা ভাড়া নেবেন না।’
হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলাদা
রাজধানীতে প্রকৃত হকারের সংখ্যা নির্ধারণে হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পার্থক্য করার ওপর গুরুত্ব দেন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান। তার মতে, চার-পাঁচ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে রাস্তায় ব্যবসা করা ব্যক্তিকে হকার হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে প্রায় ৩ হাজার ৬৭০ জন হকার রয়েছেন। এর মধ্যে হকার নীতিমালার আওতায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ জনকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে। বাকিদের জন্য নৈশ ও হলিডে মার্কেটের মতো বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে।
নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত জায়গার বাইরে বসা কিংবা বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত জায়গা দখল করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের পছন্দ হোক বা না হোক—আমরা কঠোর হব। একদম কঠিন মানে কঠিন।’
সভায় আমন্ত্রিত হকার সমিতির নেতারা এবং ডিএসসিসির অন্যান্য কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন।


