বাজারে বড় আকারের গলদা বা বাগদা চিংড়ির কদর বেশি। আকার যত বড়, দামও তত চড়া। সেই সুযোগই নিচ্ছে অসাধু একটি চক্র। চিংড়ির ওজন বাড়াতে মাছের মাথা ও শরীরের নরম অংশে সিরিঞ্জ দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্ষতিকর জেলি। এরপর সেই চিংড়িই বিক্রি হচ্ছে ফেনীর বাজারে।
সম্প্রতি ফেনী পৌর মৎস্য আড়ত ও শহরের বড় বাজারে একাধিক অভিযানে জেলিমিশ্রিত চিংড়ি জব্দ ও ব্যবসায়ীদের জরিমানা করার ঘটনা ঘটেছে। দুটি মৎস্য আড়ত থেকে ১৪০ কেজি জেলি পুশ করা গলদা চিংড়ি জব্দ এবং অর্ধলক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে, মে মাসে শহরের বড় বাজারে অভিযান চালিয়ে চার ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রায় ২৮ কেজি জেলিমিশ্রিত চিংড়ি ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, ফেনীর বাজারে মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও চিংড়িতে জেলি পুশের উৎস বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ফলে এক আড়ত থেকে অন্য বাজার, সেখান থেকে জেলার প্রত্যন্ত হাটবাজারে অনায়াসে ছড়িয়ে পড়ছে এসব ভেজাল চিংড়ি।
ওজন বাড়াতে চিংড়ির শরীরে জেলি ফেনী পৌর মৎস্য আড়ত সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বড় আকারের চিংড়ি ফেনীতে আসে। ভোরে চিংড়িবাহী ট্রাক থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ আড়তে নামানো হয়। পরে সেগুলো চলে যায় শহরের বড় বাজার, রেলগেট বাজারসহ জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে।
আড়তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বড় আকারের চিংড়ির মধ্যে বিশেষ করে কেজিতে ১০ থেকে ১৫টি হয়–এমন মাছে জেলি পুশ করার প্রবণতা বেশি। কারণ এসব চিংড়ির দাম তুলনামূলক বেশি এবং সামান্য ওজন বাড়ালেও বিক্রেতার লাভ বাড়ে।
জেলি তৈরির জন্য সিলিকা পাউডারসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আঠালো পদার্থ তৈরি করা হয়। পরে সিরিঞ্জ দিয়ে চিংড়ির মাথা কিংবা শরীরের নরম অংশে তা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রতি কেজি চিংড়িতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন পাওয়া যায়। অর্থাৎ একজন ভোক্তা যদি ১ হাজার টাকা কেজি দরে এক কেজি চিংড়ি কেনেন, তবে তিনি এমন একটি পদার্থের জন্য টাকা দিচ্ছেন, যা মাছের অংশই নয়।
ভোক্তার হাতে ধরা পড়ার পর অভিযান সম্প্রতি ফেনী বড় বাজার থেকে চিংড়ি কিনে জেলি পুশের বিষয়টি টের পান এক প্রবাসী। তিনি প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি চিংড়ি কিনেছিলেন। বাড়িতে নেওয়ার পর চিংড়ির মাথা ও শরীরের ভেতরে অস্বাভাবিক জেলির মতো পদার্থ দেখতে পান। পরে তিনি মাছগুলো নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান।
অভিযোগ পাওয়ার পর বাজারে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিক্রির জন্য রাখা চিংড়ির মধ্যে জেলির উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় কিরণ, দ্বীপক, আলী হোসেন ও হানিফ নামের চার ব্যবসায়ীকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং প্রায় ২৮ থেকে ৩০ কেজি জেলিমিশ্রিত চিংড়ি জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
এরপর ২০ জুন ফেনী পৌর মৎস্য আড়তে অভিযান চালিয়ে ‘বাংলাদেশ ফিশিং’ থেকে প্রায় ৮০ কেজি জেলি পুশ করা গলদা চিংড়ি জব্দ ও আড়তটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সর্বশেষ ৬ আগস্ট উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একই আড়তে অভিযান চালিয়ে ‘মায়ের দোয়া ফিশিং’ নামের একটি দোকান থেকে ৩৮ কেজি জেলিমিশ্রিত চিংড়ি জব্দ করা হয়।
একই ধরনের ঘটনা শুধু ফেনীতে নয়, দেশের বিভিন্ন চিংড়ি প্রসেসিং এলাকাতেও ধরা পড়ছে। গত জুলাইয়ে সাতক্ষীরায় অভিযানে ২৬০ কেজি জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ খালেদ মাহমুদ টিপু জানান, এ ধরনের রাসায়নিক মিশ্রিত চিংড়ি খেলে হজমের সমস্যা, কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়া ও লিভারে প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাই এমন চিংড়ি না খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি ক্যানসার হবে–এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট রাসায়নিকের উপাদান ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় বিষয়টি সতর্কতার সাথে দেখা জরুরি।
ফেনীর জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (পরশুরাম) সৈয়দ মোস্তফা জামান বলেন, ফেনীতে চিংড়িতে জেলি পুশ করা হয় না; দেশের যেসব এলাকায় চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করা হয়, অসাধু চক্র সেখানেই এ কাজ করে। পরে সেই মাছ বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। তবে জেলিমিশ্রিত চিংড়ি বিক্রি বন্ধে মৎস্য বিভাগ সক্রিয় রয়েছে ও নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ফেনী জেলা সভাপতি পার্থপাল চৌধুরী ও সাধারণ ভোক্তাদের মতে, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে সমাধান হবে না। যে জায়গায় জেলি ঢোকানো হচ্ছে এবং যারা এই সরবরাহ চেইনে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
যা বলছে প্রশাসন ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, ফেনীর বাজারে জেলি পুশ করা চিংড়ি বিক্রির বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে আড়তদারদের সঙ্গে বসা হবে। অনিয়ম বন্ধ না হলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
মাছের মাথা ও শরীরের সংযোগস্থলে অস্বাভাবিক ফাঁক, অস্বাভাবিক ভারী লাগা কিংবা কাটার পর জেলির মতো পদার্থ বের হলে দ্রুত প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


