স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার ও ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা ঠেকাতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এর অংশ হিসেবে ভোটার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং বিকাশ, নগদ, উপায়সহ মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে সংশোধিত আচরণবিধিতে।
একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য নিয়েও বিধান রাখা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ-স্থানীয় সরকারের এই পাঁচ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের জন্য সংশোধিত আচরণবিধিমালার খসড়া তৈরি শেষে গতকাল ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আচরণবিধিতে এনআইডি ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি নির্বাচনী সময়কালে এমএফএস লেনদেন নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত এ নজরদারি করা হতে পারে। তবে ইসি নিজে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে কমিশন।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের সংশোধিত আচরণবিধিমালা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
এদিকে, সংশোধিত আচরণবিধিতে নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারের সুযোগ থাকছে। ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনেও প্রচার চালানো যাবে। মাইক ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচার চালানো যাবে না। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় মিছিল বা শোডাউনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সময় প্রার্থী পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বা জমা দিতে পারবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট অন্য কাউকে প্রচার শুরুর আগে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ প্রয়োজনীয় শনাক্তকারী তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
নির্বাচনী প্রচারণা বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা, বানোয়াট নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য কিংবা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থীর চরিত্রহনন, সুনাম ক্ষুণ্ন করা কিংবা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার বা শেয়ার করা যাবে না।
জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক আক্রমণ কিংবা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা থাকছে। নির্বাচনী স্বার্থে ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এদিকে, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি জনসংযোগ, পথসভা ও ঘরোয়া সভা ছাড়া জনসভা বা শোভাযাত্রা করতে পারবেন না। প্রতিপক্ষের পথসভা, ঘরোয়া সভা বা প্রচারাভিযান বন্ধ করা, বাধা দেওয়া কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনও নিষিদ্ধ।
পথসভা বা ঘরোয়া সভা আয়োজন করতে হলে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিকসহ অপচনশীল উপাদানে তৈরি প্রচারপত্র, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। অন্য প্রার্থীর ব্যানার, ফেস্টুন বা বিলবোর্ডের ওপর নিজের প্রচারসামগ্রী টাঙানো কিংবা সেগুলোর ক্ষতি, বিকৃতি বা বিনষ্ট করাও নিষিদ্ধ।
নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিসে টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিডি, ডিভিডিসহ এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকছে।
কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচারের জন্য গেট, তোরণ বা ঘের নির্মাণ করতে পারবেন না। চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাও নিষিদ্ধ। প্রচারের অংশ হিসেবে ৩৫০ বর্গফুটের বেশি জায়গা নিয়ে প্যান্ডেল বা ক্যাম্প তৈরি করা যাবে না এবং বিদ্যুতের সাহায্যে আলোকসজ্জাও করা যাবে না।
প্রার্থীর ছবি, প্রচার বক্তব্য বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতীকের চিহ্নযুক্ত শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া ইত্যাদি ব্যবহার করেও প্রচার চালানো যাবে না।
এ ছাড়া কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আগে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে থাকলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সভায় সভাপতিত্ব বা অংশগ্রহণ করতে পারবেন না এবং প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রমেও জড়িত হতে পারবেন না।
সংশোধিত আচরণবিধিতে এসব বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও রাখা হয়েছে।


